ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

বর্ষায় নয়, শীতেই এসএসসি-এইচএসসি চায় শিক্ষাবিদরা; শিক্ষা ক্যালেন্ডার পুনর্বিন্যাসের জোর দাবি

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ১০:২২ এএম

বর্ষায় নয়, শীতেই এসএসসি-এইচএসসি চায় শিক্ষাবিদরা; শিক্ষা ক্যালেন্ডার পুনর্বিন্যাসের জোর দাবি

ছবিঃ সংগৃহীত

টানা বৃষ্টি, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বারবার পাবলিক পরীক্ষা ব্যাহত হওয়ায় এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। শিক্ষাবিদ, শিক্ষা গবেষক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা আয়োজন শিক্ষার্থীদের জন্য অযৌক্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই শিক্ষা ক্যালেন্ডার ঢেলে সাজিয়ে জানুয়ারিতে এসএসসি এবং জুনের আগেই এইচএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পরীক্ষা আয়োজন করলে লাখো পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনকে একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

টানা দুই বছর বন্যায় ব্যাহত পরীক্ষা

২০২৪ সালে ভয়াবহ বন্যার কারণে সিলেট বিভাগের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই বছরের ২০ জুন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সিলেট অঞ্চলের পরীক্ষা ৮ জুলাই পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর থেকেই শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের একটি বড় অংশ বর্ষা মৌসুম এড়িয়ে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে সে সময় বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি তৎকালীন সরকার।

২০২৬ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে। যদিও এবারের বন্যা ২০২৪ সালের মতো ভয়াবহ ছিল না, তবে টানা ভারী বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চট্টগ্রাম অঞ্চল। পরিস্থিতির অবনতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়।

এদিকে সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনীসহ প্রায় ৪৩টি জেলার পরীক্ষার্থীরাও চরম ভোগান্তিতে পড়েন। এসব জেলার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানালেও সরকার তা না মানায় একপর্যায়ে আন্দোলনে নামে পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ।

প্রশ্ন উঠেছে বর্ষাকালে পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে

পরপর দুই বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে পাবলিক পরীক্ষা ব্যাহত হওয়ার পর শিক্ষা অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বর্ষা মৌসুমে এসএসসি ও এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নেওয়া কতটা যৌক্তিক?

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পরীক্ষা শুধু নির্ধারিত তারিখে নেওয়াই যথেষ্ট নয়; পরীক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত, মানসিক স্বস্তি এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কোভিডের পর আর স্বাভাবিক হয়নি শিক্ষা ক্যালেন্ডার

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ফেব্রুয়ারির শুরুতে এসএসসি এবং এপ্রিলের শুরুতে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। তবে ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে সেই শিক্ষা ক্যালেন্ডার ভেঙে যায়।

এরপর কয়েক বছর সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, বিলম্বিত পরীক্ষা এবং বিভিন্ন সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চললেও এখনো পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফেরা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা বর্ষা মৌসুমে চলে আসে।

প্রশাসনের পরিকল্পনায় ঘাটতির অভিযোগ

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, সরকারকে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে যথাযথ পরামর্শ দিতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। ফলে একদিকে শিক্ষার্থীরা দুর্ভোগে পড়েছে, অন্যদিকে সরকারও সমালোচনার মুখে পড়েছে।

তাদের মতে, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস বাস্তবায়নের পাশাপাশি জলবায়ু ও দুর্যোগের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।

পরীক্ষা এগিয়ে আনার ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রীর

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ইতোমধ্যে পরীক্ষা এগিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

গত ১৪ মে তিনি বলেন, ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি শুরু হয়ে ৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হবে।

তিনি বলেন, দেরিতে পরীক্ষা নেওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। তাই ধাপে ধাপে শিক্ষা ক্যালেন্ডার এমনভাবে সাজানো হবে যাতে ডিসেম্বরকে শিক্ষাবর্ষের শেষ মাস এবং পরীক্ষার মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

এছাড়া গত ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২০২৭ সাল থেকে জানুয়ারিতে এসএসসি এবং জুন মাসে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ক্যালেন্ডার পুনর্বিন্যাসে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

‘আরও সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল’

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন আরও পরিকল্পিতভাবে করা উচিত ছিল।

তার ভাষায়,
"এত দ্রুত পরিবর্তন না করে আরও সময় নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে কেউই এই পরিবর্তনের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারছেন না।"

তিনি মনে করেন, প্রয়োজনে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের বর্ষাকালের দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করা যেত।

রাশেদা কে চৌধুরী আরও বলেন,
"শিক্ষা এমন বিষয় নয় যে যেকোনো পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নিতেই হবে। পরিবেশ, দুর্যোগ ও শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।"

তিনি শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দীর্ঘদিনের নানা সংকট ও মানসিক চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা অস্থির হয়ে পড়েছে। তাই তাদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন।

‘বর্ষা এড়িয়ে পরীক্ষা নেওয়াই বাস্তবসম্মত’

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বাস্তবতা বিবেচনায় পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করা উচিত।

তিনি বলেন,
"হেমন্তের শুরু থেকে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় দেশে অতিবৃষ্টি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। তাই এসএসসি ও এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ কিংবা বর্ষার আগে শেষ করা শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হবে।"

শিক্ষা ক্যালেন্ডার সংস্কারের দাবি জোরালো

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় শিক্ষা ব্যবস্থাকেও নতুনভাবে সাজাতে হবে। শুধু সিলেবাস বা পরীক্ষার তারিখ নয়, বরং পুরো শিক্ষা ক্যালেন্ডার এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য—সবকিছুই বিবেচনায় আসে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!