ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

এলসি ছাড়াই মূল্যসীমাহীন আমদানির সুযোগ, নতুন নীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৫, ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম

এলসি ছাড়াই মূল্যসীমাহীন আমদানির সুযোগ, নতুন নীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন

ছবিঃ সংগৃহীত

এলসির পাশাপাশি এখন থেকে কোনো মূল্যসীমা ছাড়াই সেলস বা পারচেজ কনট্রাক্টের মাধ্যমে পণ্য আমদানির সুযোগ পাবেন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকরা। একই সঙ্গে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানি, ফ্রি ট্রেড জোন ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার সুযোগসহ ব্যবসা ও বিনিয়োগে বেশ কিছু নতুন সুবিধা যুক্ত করেছে সরকার।

সোমবার (২৪ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন ‘আমদানি নীতি আদেশ’-এর গেজেট প্রকাশ করেছে। দীর্ঘদিন পর নতুন আমদানি নীতি জারি হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নতুন নীতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যবসার খরচ ও জটিলতা কমানো, শিল্পের কাঁচামাল সহজলভ্য করা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এলসি ছাড়াই আমদানিতে বড় সুযোগ

নতুন আমদানি নীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো—এলসি খোলার পাশাপাশি সেলস বা পারচেজ কনট্রাক্টের মাধ্যমে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আগের মূল্যসীমা তুলে দেওয়া।

আগের ২০২১-২০২৪ মেয়াদের আমদানি নীতি আদেশে এলসি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও পণ্য ও খাতভেদে নির্দিষ্ট মূল্যসীমা এবং বিভিন্ন শর্ত ছিল। নতুন নীতিতে সেই সীমা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

ফলে এখন থেকে সংশ্লিষ্ট নিয়ম ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসংক্রান্ত বিধিবিধান মেনে আমদানিকারকরা মূল্যসীমার বাধা ছাড়াই সেলস বা পারচেজ কনট্রাক্টের মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে পারবেন।

ব্যবসায়ীদের জন্য এর ফলে আমদানি প্রক্রিয়ায় নমনীয়তা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি করার ক্ষেত্রে আরও বেশি সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ

নতুন নীতিতে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুসরণ করে এ ধরনের মোটরসাইকেল আমদানি করা যাবে।

এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশের মোটরসাইকেল বাজারে নতুন মডেল ও উন্নত প্রযুক্তির যানবাহন প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের পছন্দের পরিসরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফ্রি ট্রেড জোন ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস

নতুন আমদানি নীতিতে ফ্রি ট্রেড জোন (মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল) এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় পণ্য সংরক্ষণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য এটি আমদানি ব্যবস্থাপনা সহজ করতে পারে।

অন্যদিকে ফ্রি ট্রেড জোনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পণ্য সংরক্ষণ, লজিস্টিকস ও পুনঃরপ্তানির কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

প্রবাসীদের বিনিয়োগেও সহজ হচ্ছে আমদানি

নতুন নীতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রবাসীদের বিনিয়োগ করা অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির সুযোগ সহজ করা হয়েছে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির সুযোগও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।

ব্যবসা সহজীকরণে গুরুত্ব

নতুন আমদানি নীতিতে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রচলিত পদ্ধতির সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি প্রক্রিয়াকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি সহজ হলে উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি উপকৃত হতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, সময় সাশ্রয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া রপ্তানিমুখী শিল্পে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রায় দুই বছর পর নতুন আমদানি নীতি

২০২১-২০২৪ মেয়াদের আমদানি নীতি আদেশের কার্যকারিতা ২০২৪ সালের ৩০ জুন শেষ হয়। এরপর নতুন নীতি জারি না হওয়া পর্যন্ত আগের নীতির আওতাতেই আমদানি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।

প্রায় দুই বছর পর নতুন আমদানি নীতি আদেশ জারি করল সরকার। ফলে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি, দেশের শিল্প ও বিনিয়োগের প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমদানি ব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন নীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে ব্যবসা সহজীকরণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিনিয়োগ ও শিল্পে কী প্রভাব পড়তে পারে

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিতে, নতুন নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন হলে আমদানি প্রক্রিয়ায় নমনীয়তা বাড়ার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল সংগ্রহ সহজ হতে পারে। বিশেষ করে এলসি ছাড়াই মূল্যসীমাহীন সেলস বা পারচেজ কনট্রাক্টের সুযোগ আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।

তবে নতুন সুবিধাগুলোর সুফল নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংকিং চ্যানেল, কাস্টমস, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং আমদানি-সংক্রান্ত অন্যান্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে অপব্যবহার, মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি বা রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ যাতে তৈরি না হয়, সেদিকেও নজরদারি জোরদার করতে হবে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘ বিরতির পর জারি হওয়া নতুন আমদানি নীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক করার বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন এসব বিধানের বাস্তব প্রয়োগ কতটা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে নতুন নীতির প্রকৃত সুফল।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!