ঢাকা রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

menu

বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে বড় বিনিয়োগে আগ্রহী জাপানি জায়ান্ট মারুবেনি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০২:২৩ পিএম

বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে বড় বিনিয়োগে আগ্রহী জাপানি জায়ান্ট মারুবেনি

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি কর্পোরেশন। দেশে দ্বিতীয় একটি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) আদলে সার কারখানা স্থাপন, আগামী ১২ মাসের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ডেটা সেন্টার চালুর উদ্যোগে সহযোগিতা এবং তথ্যপ্রযুক্তি, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
রোববার (১১ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে মারুবেনি কর্পোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসায়ুকি ওমোটোর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এসব বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দেশের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের গুরুত্ব
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সরকার কাজ করছে। এ লক্ষ্য অর্জনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী মারুবেনি কর্পোরেশনকে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, সার উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। এসব খাতে নতুন বিনিয়োগ এলে শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।
১২ মাসের মধ্যে এআই ডেটা সেন্টার চালুর পরিকল্পনা
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল বাংলাদেশে একটি আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ডেটা সেন্টার চালুর পরিকল্পনা। আগামী ১২ মাসের মধ্যে এ ধরনের ডেটা সেন্টার চালুর সরকারি পরিকল্পনার কথা বৈঠকে তুলে ধরা হয়। এ প্রকল্পে মারুবেনি কর্পোরেশনের কারিগরি সহায়তা ও সরাসরি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
আধুনিক ডেটা সেন্টার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে উঠলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি ডিজিটাল সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারের বিনিয়োগের পরিমাণ, অবস্থান, প্রযুক্তিগত কাঠামো এবং বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বৈঠকসংক্রান্ত তথ্যে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে প্রকল্পটির চূড়ান্ত বিনিয়োগ কাঠামো ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
দেশে দ্বিতীয় কাফকো সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের সার উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে (কাফকো) মারুবেনি কর্পোরেশনের বিদ্যমান বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশে আরও একটি কাফকো-ধাঁচের সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বিষয়ে আলোচনা হয়।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সারের সরবরাহ ও প্রাপ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে নতুন সার কারখানা স্থাপিত হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি এবং কৃষি খাতে সারের চাহিদা পূরণে সহায়তা মিলতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নির্মাণ, পরিচালনা, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে নতুন কারখানাটি কোথায় স্থাপন করা হবে, এর উৎপাদন সক্ষমতা কত হবে, বিনিয়োগের পরিমাণ কত এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা কী—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। আলোচনাটি আপাতত বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতেও বিনিয়োগের আগ্রহ
সার কারখানা ও এআই ডেটা সেন্টারের পাশাপাশি বাংলাদেশের জ্বালানি এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা খাতেও বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব খাতে বিদেশি বিনিয়োগ এলে নতুন প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের শিল্পায়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং উৎপাদন খাতের বিকাশে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ও আধুনিক প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য বিনিয়োগ দেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও প্রযুক্তি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
তবে এসব খাতে নির্দিষ্ট প্রকল্প, বিনিয়োগের পরিমাণ কিংবা বাস্তবায়নের সময়সূচি সম্পর্কে বৈঠক-পরবর্তী তথ্যে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।
বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ কার্যকর হলে বাড়তে পারে বাণিজ্য
বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) নিয়েও আলোচনা হয়। চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর হলে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে পণ্য ও সেবার বাণিজ্য সহজ করা, শুল্কসংক্রান্ত সুবিধা বাড়ানো এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে—যদিও এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত, বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর।
বাংলাদেশের জন্য জাপান গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদার হলে শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়নই এখন গুরুত্বপূর্ণ
মারুবেনি কর্পোরেশনের আগ্রহ বাংলাদেশের শিল্প, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে এআই ডেটা সেন্টার এবং নতুন সার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সার উৎপাদন খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলো বাস্তবে রূপ দিতে বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণ, সম্ভাব্যতা যাচাই, কারিগরি ও আর্থিক পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন সময়সূচি চূড়ান্ত করতে হবে।
এখন দেখার বিষয়, মারুবেনি কর্পোরেশনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাবগুলো কত দ্রুত বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেয় এবং এসব উদ্যোগ দেশের কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে কী ধরনের অবদান রাখে।
 

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!