রাজবাড়ী শহরের বড় বাজারে নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানাকে পুলিশের উপস্থিতিতে মারধরের ঘটনায় তিন যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে তাকে লাথি ও ঘুষি মারার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। পরে ভুক্তভোগী নারী উদ্যোক্তা মামলা করলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ গ্রেপ্তার ও মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—রাজবাড়ী পৌরসভার ধূঞ্চি ১ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত জমজম খানের ছেলে আব্দুল্লাহ আল সিয়াম খান (১৯), একই ওয়ার্ডের মো. দেলোয়ার হোসেনের ছেলে মো. রুবেল হোসেন (১৯) এবং পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ধূঞ্চি গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে মো. হেলাল উদ্দিন (৩৮)।
ব্যবসায়িক বিরোধ থেকে উত্তেজনা
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, জাকিয়া সুলতানা রাজবাড়ী বড় বাজারের কাদেরিয়া সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় ‘আস্থা পোশাক শিল্প গার্মেন্টেস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তার প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর বেতন ও মালামালের হিসাব নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, গত ২৩ আগস্ট ওই সাবেক কর্মচারী ১৫ থেকে ২০ জন লোক নিয়ে জাকিয়ার প্রতিষ্ঠানে যান। সেখানে তিনি বেতন দাবি করেন এবং জাকিয়াকে হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এর কয়েক দিন পর গত শনিবার (২৯ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে ওই বিরোধকে কেন্দ্র করে বড় বাজারের কাপড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জাকিয়া সুলতানার উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এ সময় জাকিয়া কয়েকজন নারীকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে অবস্থান করেন এবং নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার বিচার দাবি করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
পুলিশের সামনে মারধরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নারী পুলিশ সদস্য জাকিয়া সুলতানাকে নিয়ে যাচ্ছেন। এ সময় পেছন থেকে কয়েকজন যুবক তাকে লাথি ও ঘুষি মারছেন।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের উপস্থিতিতে একজন নারী উদ্যোক্তাকে মারধরের ঘটনায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও সমালোচনা দেখা দেয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে।
৯ জনের নাম উল্লেখ, আসামি অজ্ঞাত আরও ৫০-৬০
পুলিশ জানায়, ঘটনার পর সোমবার (৩১ আগস্ট) রাতে জাকিয়া সুলতানা বাদী হয়ে রাজবাড়ী সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলা দায়েরের পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মঙ্গলবার আদালতে সোপর্দ করার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের বক্তব্য
রাজবাড়ী সদর থানার ওসি উত্তম কুমার ঘোষ বলেন, নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানা থানায় মামলা করেছেন। ওই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের আদালতে সোপর্দ করা হবে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নারী উদ্যোক্তাকে মারধরের ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। পরে জাকিয়া সুলতানা থানায় মামলা দায়ের করায় পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে।
ঘটনার নেপথ্যে ব্যবসায়িক বিরোধের তদন্ত
পুলিশের কাছে দায়ের করা মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত একটি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মচারীর বেতন ও মালামালের হিসাব নিয়ে বিরোধ থেকে। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বড় বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জাকিয়া সুলতানার বিরোধে রূপ নেয়।
তবে মামলায় করা অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কারা মারধরের ঘটনায় জড়িত ছিলেন, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
একজন নারী উদ্যোক্তাকে প্রকাশ্যে এবং পুলিশের উপস্থিতিতে মারধরের অভিযোগে দায়ের হওয়া এ মামলায় এখন পর্যন্ত তিনজন গ্রেপ্তার হওয়ায় পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।

