দিনাজপুরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সরকারি সার গোডাউন থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বিপুল পরিমাণ সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ৩২৭ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন সার বিক্রির অভিযোগে বিএডিসির এক স্টোরকিপারকে আটক করেছে পুলিশ।
আটক ব্যক্তি হলেন মো. আকতারুল ইসলাম। সোমবার (২৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় সদর উপজেলার নশিপুর এলাকায় বিএডিসির সরকারি সার গোডাউনে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি গোডাউন থেকে বিপুল পরিমাণ সার নিয়মবহির্ভূতভাবে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন ও কোতোয়ালী থানা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালায়। অভিযানের পর স্টোরকিপার আকতারুল ইসলামকে আটক করা হয়।
জুলাই-আগস্টে বিক্রি ৩২৭ টনের বেশি সার
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আকতারুল ইসলাম জুলাই ও আগস্ট মাসে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই মোট ৩২৭ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন সার বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিক্রি করা সারের মধ্যে রয়েছে—
ডিএপি সার: ২২৭ মেট্রিক টন
এমওপি সার: ১০০ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন
তবে এত বিপুল পরিমাণ সরকারি সার কীভাবে গোডাউন থেকে বের করে দেওয়া হলো, কার কাছে বা কোন প্রক্রিয়ায় বিক্রি করা হয়েছে এবং এর বিপরীতে কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে—এসব বিষয় এখন তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
দুই চুক্তিবদ্ধ ডিলারও মামলার আসামি
ঘটনার সঙ্গে বিএডিসির দুই চুক্তিবদ্ধ ডিলারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা হলেন বীরগঞ্জ উপজেলার সোহাগ হোসেন এবং কাহারোল উপজেলার আনসারুল ইসলাম।
পুলিশ জানিয়েছে, সার বিক্রির ঘটনায় তাদেরও আসামি করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে সরকারি সার বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় আর কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
১৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার গোডাউন
বিএডিসি সূত্র জানায়, নশিপুর এলাকায় ‘কাঞ্চন’ ও ‘স্টিল’ নামে দুটি সরকারি সার গোডাউন রয়েছে। দুটি গোডাউনের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ১৮ হাজার মেট্রিক টন।
এসব গোডাউনে কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা বিভিন্ন ধরনের সার, বিশেষ করে এমওপি, ডিএপি ও টিএসপি মজুত রাখা হয়।
এ ধরনের সরকারি মজুত থেকে অনুমোদন ছাড়া শত শত টন সার বিক্রির অভিযোগ ওঠায় গোডাউনের মজুত, বিতরণ ও হিসাব-নিকাশ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্তে প্রকৃত মজুতের সঙ্গে সরকারি নথিতে থাকা হিসাব মিলিয়ে দেখা হলে অনিয়মের পরিমাণ আরও স্পষ্ট হতে পারে।
কৃষকদের সার সংকটের মধ্যে অনিয়মের অভিযোগ
দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সার পাওয়া নিয়ে নানা সময়ে সংকট ও হয়রানির অভিযোগ উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি গোডাউন থেকে অনুমোদন ছাড়া বিপুল পরিমাণ সার বিক্রির অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সার নির্ধারিত ডিলারদের মাধ্যমে সঠিকভাবে বিতরণের কথা। ফলে গোডাউন থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে সার বের হয়ে গেলে স্থানীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি, অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি কিংবা প্রকৃত কৃষকের কাছে সরকারি মূল্যে সার না পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তবে এ ঘটনায় সারগুলো কোথায় এবং কী দামে বিক্রি করা হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় বিএডিসি দিনাজপুর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক (সার) খুরশিদ আলম বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলায় আটক স্টোরকিপার আকতারুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট দুই চুক্তিবদ্ধ ডিলারকে আসামি করা হয়েছে।
আরও কেউ জড়িত কি না, খতিয়ে দেখছে পুলিশ
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নূরনবী বলেন, এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সরকারি সার গোডাউন থেকে অনুমোদন ছাড়া এত বিপুল পরিমাণ সার কীভাবে বিক্রি হলো, তার নেপথ্যে কোনো সিন্ডিকেট বা দীর্ঘদিনের অনিয়ম রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসছে।
তদন্তে সার বিক্রির নথি, গোডাউনের স্টক রেজিস্টার, বিতরণসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ডিলারদের সঙ্গে লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

