ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

রূপপুর প্রকল্পে ব্যয় ও কেনাকাটা নিয়ে বিতর্ক: চুক্তির কাঠামো ব্যাখ্যা করল এনপিসিবিএল

ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: জুলাই ৩০, ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

রূপপুর প্রকল্পে ব্যয় ও কেনাকাটা নিয়ে বিতর্ক: চুক্তির কাঠামো ব্যাখ্যা করল এনপিসিবিএল

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ব্যয়, যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের প্রেক্ষাপটে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে প্রকল্প পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত অনেক প্রতিবেদনে প্রকল্পের আন্তর্জাতিক চুক্তি, প্রযুক্তিগত কাঠামো এবং অর্থায়ন প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে বিচ্ছিন্ন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে প্রকল্প সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

এনপিসিবিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ড. মো. জাহেদুল হাসান লিখিত এক ব্যাখ্যায় জানান, বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে পরিচালনার প্রস্তুতির শেষ ধাপে রয়েছে। এটি কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর একটি কৌশলগত জাতীয় প্রকল্প, যার পরিকল্পনা, নকশা, নির্মাণ, অর্থায়ন, পরীক্ষা এবং কমিশনিংয়ের প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

তিনি জানান, প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার ও রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে স্বাক্ষরিত Intergovernmental Agreement (IGA) অনুযায়ী বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (BAEC) এবং রাশিয়ার JSC Atomstroyexport-এর মধ্যে Engineering, Procurement, Construction and Commissioning (EPCC) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অন্যদিকে অর্থায়নের জন্য স্বাক্ষরিত হয়েছে পৃথক Intergovernmental Credit Agreement (IGCA)।

ড. জাহেদুল হাসান বলেন, অনেকেই EPCC চুক্তিকে সাধারণ যন্ত্রপাতি ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, যা সঠিক নয়। এটি একটি Whole Plant Contract, যেখানে পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা, নির্মাণ, নিরাপত্তা বিশ্লেষণ, যন্ত্রপাতি উৎপাদন, স্থাপন, কমিশনিং, প্রযুক্তি হস্তান্তর, অপারেটর প্রশিক্ষণসহ সম্পূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয় অন্তর্ভুক্ত।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তিতে কোনো যন্ত্রপাতি, পাইপলাইন, ভবন, নির্মাণকাজ বা কমিশনিংয়ের জন্য পৃথক মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। বরং পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য একটি Whole Plant Contract Price নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কাজের অগ্রগতির বিভিন্ন ধাপ অনুযায়ী Milestone Payment নির্ধারিত রয়েছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, Milestone Payment-কে কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতির মূল্য বা কোনো বিশেষ নির্মাণকাজের মূল্য হিসেবে উপস্থাপন করা প্রকল্পের প্রকৃত চুক্তিগত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, কোনো একটি মাইলস্টোন সম্পন্ন হলেই বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (BAEC) সরাসরি ঠিকাদারকে অর্থ পরিশোধ করতে পারে না। প্রথমে সংশ্লিষ্ট কাজ চুক্তি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে কিনা তা যাচাই করে Acceptance Document স্বাক্ষরিত হয়। এরপর সেই মাইলস্টোন ঋণচুক্তির আওতায় অর্থছাড়ের জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হয়। সর্বশেষ Intergovernmental Credit Agreement (IGCA) অনুযায়ী রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ঋণের অর্থ ছাড় করে।

তিনি বলেন, ফলে BAEC নিজ উদ্যোগে অর্থ ছাড় করতে পারে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

ব্যাখ্যায় আরও উল্লেখ করা হয়, রূপপুরে ব্যবহৃত VVER-1200 Generation III+ প্রযুক্তি একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং মালিকানাধীন (Proprietary) পারমাণবিক প্রযুক্তি। এর নিরাপত্তা, লাইসেন্সিং এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাপী অনুসৃত EPCC মডেলই অনুসরণ করা হয়েছে।

ড. জাহেদুল হাসান আরও বলেন, সরকারি ক্রয় আইনে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র সাধারণ নিয়ম হলেও প্রযুক্তিগত এককত্ব, মেধাস্বত্ব, নিরাপত্তা এবং আন্তঃসরকারি চুক্তির ক্ষেত্রে একক উৎস থেকে ক্রয়ের আইনগত সুযোগ রয়েছে। রূপপুর প্রকল্প সেই বিশেষ প্রকৃতির আন্তর্জাতিক প্রকল্পগুলোর অন্যতম।

তার মতে, দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং উচ্চপ্রযুক্তি সক্ষমতা অর্জনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। তাই এ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক প্রকল্পের চুক্তিগত বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং অর্থায়ন কাঠামো সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, "তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্প সম্পর্কে সঠিক ধারণা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।"

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!