বরাদ্দের আগেই ‘বিক্রি’ হচ্ছে সার, ডিলারের গুদাম খালি দেখিয়ে খুচরা বাজারে চড়া দাম—সিন্ডিকেটের অভিযোগে জিম্মি আমনচাষিরা আমন মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে ভর্তুকির সার নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র অস্বস্তি। সরকারি বরাদ্দ ও সরবরাহ থাকার পরও অনুমোদিত ডিলারের দোকানে মিলছে না প্রয়োজনীয় সার। অথচ একই সার খুচরা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বাড়তি দামে। কৃষকদের অভিযোগ, সার বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
গত দুই সপ্তাহ ধরে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সারের বাজারে এমন পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন কৃষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, কোনো কোনো ডিলার বরাদ্দ পাওয়ার আগেই বরাদ্দপত্র বা বরাদ্দের সার কালোবাজারিদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ গুদাম থেকে সার তোলার পর নির্ধারিত ডিলার পয়েন্টে না নিয়ে সরাসরি খুচরা বিক্রেতা কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে সরবরাহ করছেন।
ফলে সরকারি দামে সার না পেয়ে কৃষকদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপি সার সরকারি নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫০ টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ৮০০ টাকা, আর ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকার পরিবর্তে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও এমওপিসহ অন্যান্য সারের দামও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
বরাদ্দ আছে, তবু ডিলারের দোকানে সার নেই
রাজশাহী অঞ্চলের মাঠপর্যায়ের চিত্রে দেখা গেছে, আমন রোপণকে কেন্দ্র করে কৃষকদের ব্যস্ততা বেড়েছে। ভোর থেকে কৃষকেরা জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ ও সার প্রয়োগে ব্যস্ত। কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে সার না পাওয়ায় তাঁদের অনেকেই বিপাকে পড়েছেন।
পবা উপজেলার বড়াইকুড়ি গ্রামের কৃষক রাসেল হোসেন বলেন, ‘আমার কৃষি কার্ড আছে। কয়েকবার অনুমোদিত ডিলারের কাছে গিয়েও সার কিনতে পারিনি। সরকারি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বেশি দাম দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে।’
তানোর উপজেলার ছোট পলাশী গ্রামের কৃষক সাজেদুর রহমানও একই অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, ডিলারের দোকানে গেলে ‘সার নেই’ বলা হচ্ছে। পরে খুচরা দোকানে গেলে বেশি দামে একই সার পাওয়া যাচ্ছে।
দুই-তিন দিনেই মজুত শেষ—ডিলারদের দাবি
পবা উপজেলার নওহাটা বাজারের বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনুমোদিত ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্স এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল হক বলেন, তাঁর আওতাধীন ৪২টি মৌজায় কয়েক হাজার কৃষককে সার দিতে হয়। জুলাই মাসে তিনি মাত্র ২২ বস্তা টিএসপি, ৭০ বস্তা এমওপি ও ১১০ বস্তা ডিএপি পেয়েছেন। তাঁর দাবি, সরবরাহ পাওয়ার দুই-তিন দিনের মধ্যেই এসব সার শেষ হয়ে যায়।
তবে ডিলারের পাশের একটি খুচরা দোকানে গিয়ে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে ৫০ কেজির এক বস্তা ডিএপি সরকারি মূল্যের চেয়ে ৫৫০ টাকা বেশি, অর্থাৎ ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়।

ওই দোকানের এক কর্মচারীর দাবি, বিভিন্ন উৎস থেকে সার সংগ্রহ করে তাঁরা বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভর্তুকির সারও কয়েকজন মধ্যস্থতাকারীর হাত ঘুরে খুচরা বাজারে পৌঁছায়।
ক্যাশ মেমো না দেওয়ার অভিযোগ
কৃষকদের অভিযোগ, নির্ধারিত মূল্যের বাইরে সার বিক্রির সময় অনেক ক্ষেত্রে ক্যাশ মেমো দেওয়া হচ্ছে না। এতে প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ও সার কোথা থেকে এসেছে—তা যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
কৃষকদের একাংশের অভিযোগ, ডিলার, খুচরা বিক্রেতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি অংশের যোগসাজশেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ এর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বরাদ্দ বেড়েছে, তাহলে সংকট কেন?
সারের সংকট নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় চলতি বছরের জুলাইয়ে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির সম্মিলিত বরাদ্দ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে এসব সারের বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৮৭৬ টন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৩৩৩ টন। আগস্টেও টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে।
অর্থাৎ কাগজে-কলমে সরবরাহ বাড়লেও মাঠে কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ—এই চার জেলায় চলতি আমন মৌসুমে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪০ শতাংশ জমিতে চারা রোপণ হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জেও কৃষকদের বিক্ষোভ
সারের সংকট শুধু রাজশাহীতে সীমাবদ্ধ নয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরেও চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকেরা বিক্ষোভ করেছেন।
গত ১২ আগস্ট রহনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা উপজেলা পরিষদ চত্বরে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে তাঁরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রয়োজন অনুযায়ী ও নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহের দাবি জানান।
কৃষকদের ভাষ্য, আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিলারের দোকানে সার না থাকায় তাঁদের খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন তাঁরা।
প্রশাসনের বক্তব্য—অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা
বিএডিসি রাজশাহী শাখার সহকারী পরিচালক (সার) নাসির উদ্দিন বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত বরাদ্দ অনুযায়ীই সার বিতরণ করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, কৃষকেরা সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি সার প্রয়োগ করায় কোনো কোনো এলাকায় চাহিদা বেড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের উপপরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, তাঁদের কাছে সারের ঘাটতি নিয়ে বড় ধরনের অভিযোগ আসেনি। তবে আমন মৌসুমে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
রাজশাহী জেলা সার বিতরণ কমিটির প্রধান ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, সারের দাম বেশি নেওয়ার বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো কৃষক অভিযোগ করেননি। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিল্লুর রহমানও জানিয়েছেন, ডিলারদের মাধ্যমে কৃষকেরা যাতে নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় সার পান, তা নিশ্চিত করতে তদারকি করা হচ্ছে। নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে বিক্রি, অবৈধভাবে মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা কৃষকদের হয়রানির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
কৃষকের প্রশ্ন—বরাদ্দের সার যাচ্ছে কোথায়?
একদিকে সরকারি হিসাবে বরাদ্দ বাড়ছে, অন্যদিকে মাঠে নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ার অভিযোগ বাড়ছে। ফলে কৃষকদের সরল প্রশ্ন—সরকারি বরাদ্দের সার যদি যথাসময়ে ডিলারের কাছে পৌঁছায়, তাহলে খুচরা বাজারে একই সার বেশি দামে আসছে কীভাবে?
কৃষকদের দাবি, শুধু সভা করে সার সংকট নেই বললেই হবে না; প্রতিটি ডিলারের বরাদ্দ, উত্তোলন, মজুত ও বিক্রির হিসাব ডিজিটালভাবে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে ডিলার পয়েন্টে নিয়মিত অভিযান, বাধ্যতামূলক ক্যাশ মেমো এবং সরকারি মূল্যের তালিকা দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন নিশ্চিত করতে হবে।
আমন মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র বের করা না গেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন হাজারো কৃষক। তাই বরাদ্দ থেকে কৃষকের জমি পর্যন্ত সারের পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

