আকাশে কালো মেঘ জমলেই আতঙ্কে কেঁপে ওঠে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার দক্ষিণ চরখালী গ্রামের এক অসহায় পরিবার। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলেই জরাজীর্ণ একটি কুঁড়েঘরের ভেতরে নেমে আসে দুর্বিষহ অবস্থা। মাথার ওপর টিনের ছাদ নেই, নেই নিরাপদ আশ্রয়। জীর্ণ পাতার বেড়া আর একটি ছেঁড়া পলিথিনই এখন পাঁচটি প্রাণের একমাত্র ভরসা। সামান্য বৃষ্টিতেই সেই পলিথিন ভেদ করে টুপটাপ পানি পড়ে ঘরের ভেতরে। ভেজা মেঝেতে চার কন্যাসন্তানকে বুকে আগলে নির্ঘুম রাত কাটান অসহায় মা রেকসোনা।
স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই জীবন যেন তার কাছে এক অন্তহীন সংগ্রামের নাম। নিজের কোনো জমি নেই, নেই মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানা। অন্যের দেওয়া সামান্য জায়গায় গড়ে ওঠা ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরেই চার মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। প্রতিদিনের প্রধান লড়াই দুবেলা দুমুঠো খাবারের ব্যবস্থা করা। সেই লড়াইয়ের মাঝেই সন্তানদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দিনরাত দুশ্চিন্তায় কাটছে তার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পরিবারের কোনো নিয়মিত আয়ের উৎস নেই। কখনো মানুষের বাড়িতে খণ্ডকালীন কাজ করে, কখনো প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় কোনো রকমে দিন চলে। অনেক দিনই পরিবারের সদস্যদের আধপেটা কিংবা না খেয়েই থাকতে হয়। আর বৃষ্টি কিংবা ঝড়ের রাতে ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়লে দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতায় চার কন্যাসন্তানের লেখাপড়াও প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। প্রয়োজনীয় বই-খাতা, পোশাক কিংবা নিয়মিত খাবারের অভাবে তাদের স্কুলে যাওয়া অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব, শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার পরিবর্তে প্রতিদিনই তাদের লড়তে হচ্ছে অনিশ্চয়তা আর অভাবের সঙ্গে।
রেকসোনা জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে চার মেয়েকে মানুষ করাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া তাদের বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রতিবেশীদের দেওয়া খাবার, পুরোনো কাপড় কিংবা দান করা কম্বলই এখন তাদের সম্বল। তবুও সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট সহ্য করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। জরুরি ভিত্তিতে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা না পেলে তাদের অবস্থা আরও ভয়াবহ হতে পারে। একটি নিরাপদ ঘর, খাদ্য সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্তি এবং শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবী ও বিত্তবান ব্যক্তিদের সম্মিলিত উদ্যোগে এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো গেলে চারটি শিশুর জীবন নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যেতে পারে। একটি নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাদ্য সহায়তা এবং শিক্ষার সুযোগই পারে পলিথিনের নিচে বেড়ে ওঠা এই চার শিশুর ভবিষ্যৎকে আলোকিত করতে।

