বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রকৌশলী বিভাগে পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রশাসনিক অসংগতি এবং আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর সংস্থাটির সাম্প্রতিক সব পদোন্নতি কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
গত ৩ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব শারমিন আক্তার স্বাক্ষরিত এক সরকারি চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা গুরুতর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হবে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাম্প্রতিক সব পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে।
অভিযোগের সূত্র
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক কর্মকর্তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রকৌশলী বিভাগে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ থেকে ১৫টি অনুমোদিত পদ প্রত্যাহার করে বিধিবহির্ভূতভাবে নতুন পদোন্নতির প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। এ বিষয়ে গত ২৮ জুন একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) পার্ট-১৪৫ বিধিমালা অনুযায়ী অনুমোদিত কারিগরি জনবল কমিয়ে দেওয়ায় বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রাখা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান পরিচালনায় কারিগরি জনবলের ঘাটতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান ও অপারেশনাল সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কনিষ্ঠদের পদোন্নতি, অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২২ সালের শেষ দিকে যোগ দেওয়া কয়েকজন কনিষ্ঠ কর্মীকে অস্বাভাবিকভাবে গ্রুপ-৬ পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।
এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩১ লাখ টাকার অবৈধ আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরও যেসব অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে একাধিক প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
দীর্ঘদিন যোগ্য প্রকৌশলীদের পদোন্নতি আটকে রাখা।
বাধ্যতামূলক সাক্ষাৎকার ছাড়াই পদোন্নতি প্রদান।
বদলির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পদ শূন্য দেখিয়ে পরে আগের পদে পুনর্বহাল।
জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে জুনিয়রদের পদোন্নতি।
টেকনিক্যাল দায়িত্ব পালন না করেও বিশেষ ভাতা প্রদান।
কাগজে-কলমে ভিন্ন পদায়ন দেখিয়ে সুবিধা প্রদান।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ।
সাংগঠনিক কাঠামোয় অস্তিত্বহীন পদে বেতন-ভাতা প্রদান।
অনিয়মে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অন্য বিভাগে বদলি।
মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগেও বিধিবহির্ভূত পদোন্নতির অভিযোগ।
এ ছাড়া আটজন যোগ্য প্রকৌশলীর পদোন্নতির ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা এবং লাইসেন্স ভাতা বন্ধ রাখার অভিযোগও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে জানা গেছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব কার্যক্রম বন্ধ
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা তারা ইতোমধ্যে পেয়েছেন এবং বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা না দেওয়া পর্যন্ত সম্প্রতি গৃহীত সব পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং দক্ষতা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মেধা, যোগ্যতা ও বিধিমালার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করা গেলে সংস্থার প্রতি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।

