নাটোরের সিংড়া পৌর শহরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র চাউলপট্টি ও কাঁচাবাজারের ছাদ এবং টিনশেড অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পুরোনো ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল, পলেস্তারা খসে পড়া এবং কাঁচাবাজারের টিনশেডের বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এতে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে প্রতিদিন বাজারে আসা ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে সিংড়া পৌরসভা চাউলপট্টি ও কাঁচাবাজারটি নির্মাণ করে। নির্মাণের পর তিন দশকের বেশি সময় পার হলেও বাজারটির বড় ধরনের সংস্কার কিংবা কাঠামোগত মেরামতের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে ভবনের বিভিন্ন অংশের অবস্থা ক্রমেই নাজুক হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে কাঁচাবাজারের টিনশেডও নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির সময় পানি পড়ে ব্যবসায়ীদের পণ্য ও দোকানের মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বর্তমানে বাজারটিতে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি দোকান রয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব দোকানে চাল, কাঁচা সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাবেচা হয়। প্রতিদিন শত শত ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখর থাকে বাজারটি। ফলে ভবনের কোনো অংশ ভেঙে পড়লে কিংবা টিনশেডের কোনো অংশ খুলে পড়লে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারের ছাদ ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে ফাটল দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ছে। পুরোনো ভবনের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দোকানে বসে ব্যবসা করার সময়ও অনেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বিশেষ করে ক্রেতাদের ভিড়ের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
ব্যবসায়ী মো. হিরা বলেন, “বাজারটি অনেক পুরোনো। দীর্ঘদিন ধরে ছাদ ও ভবনের প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি। আমরা প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে দোকানে বসি। কখন কী ঘটে, তা নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়। দ্রুত সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”
কাঁচা সবজি ব্যবসায়ী সেন্টু বলেন, “প্রতিদিন এখানে অনেক মানুষ কেনাকাটা করতে আসেন। ছাদের অবস্থা নিয়ে আমরা চিন্তায় থাকি। কর্তৃপক্ষ দ্রুত বাজারটি পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ মেরামত করলে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের আতঙ্ক কমবে।”
চাল ব্যবসায়ী নরোত্তম সাহা বলেন, “বাজারটি দীর্ঘদিনের পুরোনো। ভবনের বয়সও অনেক হয়েছে। শুধু ওপর থেকে মেরামত করলেই হবে না, পুরো কাঠামো পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা দরকার। ভবিষ্যতে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
চাল ব্যবসায়ী মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, “কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে সংস্কার করা জরুরি। আমরা পৌর কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ চাই। ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”

বাজারের আরেক ব্যবসায়ী মিলন কুন্ড বলেন, “আমরা খুব কষ্টে আছি। বৃষ্টি হলেই টিনশেড দিয়ে পানি পড়ে। এতে দোকানের মালামাল রাখা কঠিন হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যার মধ্যে ব্যবসা করছি। বাজারটি দ্রুত সংস্কার করা হলে আমাদের দুর্ভোগ কমবে।”
চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. মাহাবুর রহমান বলেন, “চাউলপট্টি ও কাঁচাবাজার সিংড়া শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার। এখানে প্রতিদিন প্রচুর মানুষ আসেন। ভবনের ছাদসহ বিভিন্ন অংশের অবস্থা পরীক্ষা করে দ্রুত সংস্কারের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বাজারটির বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই করা হোক। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ভবনের ছাদ, দেয়াল, বিম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরীক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করতে হবে। যেসব অংশ মেরামতের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করা সম্ভব, সেগুলো দ্রুত সংস্কার এবং যেসব অংশ অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে সিংড়া পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন, “বাজারটির বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখব। প্রয়োজন হলে সরেজমিনে পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করা হবে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি জনবহুল বাজারের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পৌর কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের পুরোনো ভবনের ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশলগত পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। শুধু দৃশ্যমান ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত নয়, পুরো ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা যাচাই করাও প্রয়োজন।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার করা না হলে চাউলপট্টি ও কাঁচাবাজারের দুর্বল ছাদ কিংবা জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কোনো অংশ ভেঙে পড়ে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে দুর্ঘটনা ঘটার আগেই বাজারটির ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সংস্কার, টিনশেড মেরামত এবং সার্বিক অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিংড়া পৌর কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

