ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

সাত বছরেও খুলল না শাহবাগ শিশুপার্ক, শৈশবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত এক প্রজন্ম

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ১২:১৯ পিএম

সাত বছরেও খুলল না শাহবাগ শিশুপার্ক, শৈশবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত এক প্রজন্ম

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীর শাহবাগের ঐতিহ্যবাহী শহীদ জিয়া শিশু পার্ক আধুনিকায়নের নামে দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ। এক বছরের মধ্যে সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সময় পেরিয়েছে একের পর এক বছর। কিন্তু এখনো পার্কটি শিশু-কিশোরদের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় ও স্বল্প ব্যয়ের বিনোদনকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

একসময় যে পার্কে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশুদের কোলাহল, হাসি-আনন্দ আর বিভিন্ন রাইডে চড়ার ব্যস্ততা ছিল, সেখানে এখন নেই সেই পরিচিত দৃশ্য। নেই পুরোনো রাইড, নেই শিশুদের ভিড়। পার্কের বড় একটি অংশে নির্মাণ করা হয়েছে ভূগর্ভস্থ পার্কিং। সামনে গড়ে উঠেছে টং দোকান। আর পার্কটি কবে নাগাদ পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে শিশুদের জন্য খুলে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বলছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপ, রাইড কেনার প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নানা কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে রাইড কেনা ও স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পার্কটি চালু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এক বছরের কাজ, সাত বছরেও শেষ নয়

শাহবাগ শিশুপার্ক বন্ধের ইতিহাস শুরু হয় ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। এর আগে ‘ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ—তৃতীয় পর্যায়’ প্রকল্পের আওতায় পার্কের নিচে ভূগর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

প্রকল্পের কারণে পার্কের বেশ কিছু রাইড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। নতুন রাইড কেনা এবং পার্ক আধুনিকায়নের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ডিএসসিসিকে প্রায় ৭৮ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছিল। তবে ওই অর্থকে অপর্যাপ্ত মনে করে তৎকালীন ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন প্রস্তাবটি নাকচ করেন। এরপর নিজেদের উদ্যোগে পার্কটি আধুনিকায়নের পরিকল্পনা করে ডিএসসিসি।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে পার্কের সামনে বিজ্ঞপ্তি টাঙিয়ে এটি সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পার্কটি বন্ধ থাকবে।

কিন্তু সেই সাময়িক বন্ধের মেয়াদ আর সাময়িক থাকেনি। এক বছর, দুই বছর করে পেরিয়ে গেছে সাত বছরের বেশি সময়।

৬০৩ কোটি টাকার প্রকল্প

২০২০ সালের মে মাসে ডিএসসিসির মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর শেখ ফজলে নূর তাপসের সময় পার্কটি আধুনিকায়নে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য প্রায় ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়।

২০২৩ সালের আগস্টে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রকল্পের আওতায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ৪৮৩ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল। এর অর্ধেক অনুদান এবং বাকি অর্ধেক ঋণ হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। পাশাপাশি ডিএসসিসির নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা রয়েছে।

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ রাখা হয় শিশু পার্কের বিভিন্ন আধুনিক রাইড কেনা ও স্থাপনের জন্য। এ খাতে প্রায় ৪৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ১৫টি আধুনিক রাইড আনার কথা রয়েছে।

কিন্তু প্রকল্প অনুমোদনের পরও রাইড কেনার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে এগোয়নি। দরপত্র চূড়ান্ত হওয়ার আগেই রাইডগুলোর মূল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক পর্যায়ে পরিবর্তনের কারণে রাইড কেনার প্রক্রিয়াও থমকে যায়।

আধুনিকায়নের নামে দীর্ঘ অপেক্ষা

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ডিএসসিসির প্রশাসনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আসে। নতুন প্রশাসনের সময় পার্কটির প্রকল্প আবার পর্যালোচনা করা হয়। রাইড কেনা, প্রকল্পের ব্যয়, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং অবকাঠামোগত কাজসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রশাসনিক ধাপ, নকশা ও কারিগরি বিষয়, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং রাইড আমদানির মতো বিষয় থাকায় কাজ দ্রুত শেষ করা সম্ভব হয়নি।

তবে নগরবাসীর প্রশ্ন—একটি শিশু পার্ক আধুনিকায়নে এত দীর্ঘ সময় কেন লাগবে?

বিশেষ করে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে যেখানে শিশুদের খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্রের সংকট রয়েছে, সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিশু পার্ক বছরের পর বছর বন্ধ থাকা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

হারিয়ে গেছে শিশুদের চেনা সেই কোলাহল

একসময় শাহবাগ শিশুপার্ক ছিল ঢাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের অন্যতম বিনোদনের ঠিকানা। অল্প খরচে বিভিন্ন রাইডে চড়ার সুযোগ থাকায় ছুটির দিনগুলোতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে এখানে আসতেন।

অনেক পরিবারের কাছে শিশুপার্কে যাওয়া ছিল শৈশবের স্মৃতির অংশ। বিভিন্ন রাইড, শিশুদের উচ্ছ্বাস আর অভিভাবকদের ব্যস্ততায় পার্ক এলাকা থাকত প্রাণচঞ্চল।

কিন্তু সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকায় সেই দৃশ্য এখন কেবল স্মৃতি। ২০১৯ সালের পর জন্ম নেওয়া বা তখন খুব ছোট থাকা অনেক শিশুই এখন স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যাচ্ছে, অথচ তারা শাহবাগ শিশুপার্কের পুরোনো রাইডগুলোতে চড়ার সুযোগই পায়নি।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ ও বিনোদনকেন্দ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই একটি বড় শিশু বিনোদনকেন্দ্র দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা নগরবাসীর জন্য শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, সামাজিক ও মানসিকভাবেও নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে।

পার্কের ভেতরে এখন নির্মাণের চিত্র

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, পুরোনো শিশুপার্কের চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে। পার্কের বড় একটি অংশে ভূগর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণ করা হয়েছে। পার্কিংয়ের ছাদ মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচু। আগের রাইডগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই।

পার্কের সামনের অংশেও বদলে গেছে পরিবেশ। সেখানে বসেছে কয়েকটি টং দোকান। দীর্ঘদিন পার্ক বন্ধ থাকায় এলাকাটি আগের মতো শিশু ও অভিভাবকদের আনাগোনায় মুখর হয় না।

গত ২৯ আগস্ট বিকেলে মুগদা থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শাহবাগ শিশুপার্কের সামনে আসেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, আগে অল্প টাকায় সন্তানদের নিয়ে এখানে আসা যেত। ছুটির দিনে পার্কে প্রচুর ভিড় থাকত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের নামে পার্ক বন্ধ থাকায় শিশুদের নিয়ে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়।

পার্কের ফটকের ভেতরে টং দোকানে চা-পান বিক্রি করা আতাউর জানান, সরকারি ছুটির দিনেও অনেক বাবা-মা সন্তানদের নিয়ে পার্কের সামনে আসেন। পার্ক বন্ধ দেখে তাদের হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়।

‘একটি প্রজন্মের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নেওয়া হয়েছে’

শাহবাগ শিশুপার্কের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিকল্পনাবিদরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নের নামে দীর্ঘদিন পার্ক বন্ধ রাখা হয়েছে। বিষয়টি শুধু গণপূর্ত অধিদপ্তর বা সিটি করপোরেশনের সমন্বয়হীনতা নয়, বরং সরকারের গাফিলতিরও প্রতিফলন।

তার ভাষায়, “সরকার একটি প্রজন্মের শিশুদের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। এজন্য সরকারকে ক্ষমা চাইতে হবে। পাশাপাশি পার্কের কাজটি যাতে দ্রুত সময়ে শেষ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।”

পরিকল্পনাবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয়ের হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিনোদনকেন্দ্র বছরের পর বছর বন্ধ রেখে আধুনিকায়ন করা হলে প্রকল্পের সামাজিক সুফল অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়।

২০২৭ সালের জুনে চালুর আশা

ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি শাহবাগ শিশুপার্কের সংস্কার ও আধুনিকায়ন কাজের খোঁজখবর নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।

ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, রাইড কেনা ও স্থাপনসহ বাকি কাজগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের জুনে শাহবাগ শিশুপার্ক আবার চালু করা সম্ভব হবে।

তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা, এবার যেন আর নতুন কোনো জটিলতা বা দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে না হয়। সাত বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত পার্কটি শিশু-কিশোরদের জন্য খুলে দেওয়া হবে—এটাই এখন অভিভাবক ও নগরবাসীর প্রধান দাবি।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!