ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

রবি-বোরোর আগে সারের আমদানি বাড়ছে, সেপ্টেম্বরে আসছে আড়াই লাখ টন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম

রবি-বোরোর আগে সারের আমদানি বাড়ছে, সেপ্টেম্বরে আসছে আড়াই লাখ টন

ছবিঃ সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে কিছুদিন নন-ইউরিয়া সার আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও পরিস্থিতি কাটিয়ে আবারও গতি পেয়েছে আমদানি কার্যক্রম। আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমে কৃষকের চাহিদা মেটাতে সেপ্টেম্বর মাসেই ডিএপি, এমওপি ও টিএসপির সাতটি জাহাজে প্রায় আড়াই লাখ টন সার দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বরের চালানের পর অক্টোবরেও নন-ইউরিয়া সার নিয়ে আরও প্রায় ১০টি জাহাজ দেশে আসার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১২টি জাহাজে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে মৌসুমের আগেই সার সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সেপ্টেম্বরে আসছে আড়াই লাখ টন সার

চলতি সেপ্টেম্বর মাসে যে সাতটি জাহাজ দেশে আসার কথা রয়েছে, সেগুলোতে মোট প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন নন-ইউরিয়া সার থাকবে। এর মধ্যে মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) ১ লাখ ৫০ হাজার টন, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) ৬০ হাজার টন এবং ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ৪০ হাজার টন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, মরক্কো থেকে ৬০ হাজার টন টিএসপি নিয়ে দুটি জাহাজ দেশে আসবে। এর একটি ৮ সেপ্টেম্বর এবং অন্যটি ১১ সেপ্টেম্বর পৌঁছানোর কথা রয়েছে। একই দেশ থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি নিয়ে আরেকটি জাহাজ ৮ সেপ্টেম্বর দেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়া ও কানাডা থেকে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার টন এমওপি আমদানি করা হচ্ছে। রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন করে দুটি চালানে ৭০ হাজার টন এবং কানাডা থেকে ৪০ হাজার টন করে দুটি চালানে ৮০ হাজার টন এমওপি আসবে। চারটি চালানের মধ্যে দুটি জাহাজ চলতি সপ্তাহে এবং অন্য দুটি ১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

অক্টোবরেও আসবে আরও সার

বিএডিসি ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবরেও ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি নিয়ে প্রায় ১০টি জাহাজ দেশে আসতে পারে। এসব চালানের কয়েকটির লোডিং ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, আবার কিছু চালান লোডিং পর্যায়ে রয়েছে।

বিএডিসির সার আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২টি জাহাজে নন-ইউরিয়া সার আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের চালানগুলো ইতোমধ্যে দেশের পথে রয়েছে। অক্টোবরের কয়েকটি চালানের লোডিং শেষ হয়েছে এবং পরবর্তী চালান নিশ্চিত করতে দ্রুত ঋণপত্র (এলসি) খোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

রবি-বোরো মৌসুমে বাড়বে সারের চাহিদা

সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে বিভিন্ন ফসলের আবাদ ঘিরে সারের চাহিদা দ্রুত বাড়ে। বিশেষ করে অক্টোবরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়কে সারের পিক মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই সময়ে শীতকালীন সবজি, আলু, পেঁয়াজ, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি বোরো ধানের আবাদ শুরু হয়। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বছরের মোট সারের চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ এই মৌসুমে তৈরি হয়। ফলে চাহিদা বাড়ার আগেই আমদানি, মজুত ও মাঠপর্যায়ে বিতরণব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অক্টোবরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন হলে কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তাই এখন থেকেই পর্যাপ্ত মজুতের পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ডিএপিতে বড় চাহিদা, আমদানিও চলছে

বিএডিসির হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পিক মৌসুমে দেশে ডিএপির চাহিদা প্রায় ১১ লাখ ২৭ হাজার টন। এর বিপরীতে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি প্রক্রিয়াধীন ও আলোচনাধীন রয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার টন ডিএপি।

একই সময়ে এমওপির চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭২ হাজার টন। এর বিপরীতে আমদানি প্রক্রিয়াধীন ও আলোচনাধীন রয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার টন। অর্থাৎ এমওপির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য আমদানির পরিমাণ চাহিদার কাছাকাছি।

অন্যদিকে টিএসপির চাহিদা প্রায় ৫ লাখ ১৯ হাজার টন। এর বিপরীতে চূড়ান্ত আমদানি প্রক্রিয়া ও সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টন আমদানির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে আমদানিতে সাময়িক ধাক্কা

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতার থেকে সার আমদানিতে সাময়িকভাবে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে। এতে বাংলাদেশের সার সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। মরক্কো, রাশিয়া ও কানাডা থেকে সার আনার মাধ্যমে সরবরাহের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সার আমদানি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। চাহিদা অনুযায়ী প্রতি মাসেই প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার আমদানি করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরব ও কাতার থেকে কিছুদিন সার আমদানি ব্যাহত হলেও বর্তমানে বিকল্প উৎস থেকে সার আনা হচ্ছে। ফলে সার আমদানিতে কোনো অনিশ্চয়তা নেই।

আগের মৌসুমের অভিজ্ঞতায় বাড়তি নজর

এর আগে আমন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। কোথাও কোথাও ডিলারের গুদামে সার না থাকার অভিযোগে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। কুড়িগ্রামে ডিলারের গুদাম ভেঙে কৃষকদের সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়।

যদিও কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে সার সংকট নেই। তবে মাঠপর্যায়ে চাহিদার সময় সঠিকভাবে সার না পৌঁছালে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কৃষকের কাছে সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই আমদানির পাশাপাশি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সুষ্ঠু বিতরণ ও ডিলারদের মজুত ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শুধু আমদানি নয়, বিতরণেও নজরদারি জরুরি

কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর রাখা জরুরি। বিশেষ করে রবি ও বোরো মৌসুমে কোনো এলাকায় হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেলে দ্রুত অতিরিক্ত সার সরবরাহের সক্ষমতা থাকতে হবে।

একই সঙ্গে ডিলার পর্যায়ে মজুত, বিক্রয়মূল্য ও সরবরাহের ওপর নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। কারণ আমদানি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সার থাকলেও বিতরণব্যবস্থায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে কৃষককে বাড়তি দামে সার কিনতে হতে পারে।

উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রভাব পড়তে পারে খাদ্য নিরাপত্তায়

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে রাসায়নিক সারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে বোরো ধানের মতো উচ্চফলনশীল ফসলের উৎপাদনে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ প্রয়োজন। ফলে সারের সংকট শুধু কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ায় না, বরং সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন ও বাজারদরেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকলেও আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সার আমদানি, পর্যাপ্ত মজুত এবং কৃষকের কাছে সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে রবি ও বোরো মৌসুম সামনে রেখে নন-ইউরিয়া সার আমদানিতে নতুন গতি এসেছে। সেপ্টেম্বরে প্রায় আড়াই লাখ টন সার দেশে আসার পাশাপাশি আগামী কয়েক মাসে আরও বিপুল পরিমাণ ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এখন এই আমদানির চালানগুলো সময়মতো দেশে পৌঁছানো এবং সুষ্ঠুভাবে কৃষকের কাছে বিতরণ করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে বিকল্প উৎস ও আগাম মজুতই কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার প্রধান নিরাপত্তাবলয় হয়ে উঠতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!