ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

৪৮ বছরে বিএনপি: জিয়া-খালেদা থেকে তারেক, ক্ষমতায় ফিরে নতুন পরীক্ষার মুখে দল

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ০৯:৫২ এএম

৪৮ বছরে বিএনপি: জিয়া-খালেদা থেকে তারেক, ক্ষমতায় ফিরে নতুন পরীক্ষার মুখে দল

ছবিঃ সংগৃহীত

প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত দলটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায়, কখনো প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকেছে। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠা, খালেদা জিয়ার দীর্ঘ নেতৃত্ব এবং বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্ব—এই তিন পর্বে বিএনপির রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছে। দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি পেরিয়ে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে দলটির সামনে এখন সংগঠন নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জনগণের আস্থা ধরে রাখা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের বড় পরীক্ষা।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও আত্মনির্ভরতার ধারণাকে সামনে রেখে দলটির রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মসূচি গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মসূচির অন্যতম ভিত্তি ছিল ১৯ দফা।

প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক মত, পেশা ও শ্রেণির মানুষকে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয় বিএনপি। অল্প সময়ের মধ্যেই দলটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।

১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বড় ধরনের নির্বাচনী সাফল্য দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি আরও শক্ত করে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সংগঠন বিস্তারের মধ্য দিয়ে বিএনপি জাতীয় রাজনীতিতে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করে। তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দলটি নেতৃত্বের সংকটে পড়ে। সেই সংকট কাটিয়ে পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া।  ১৯৮২ সালে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

এরপর প্রায় চার দশক ধরে বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন খালেদা জিয়া। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার নেতৃত্ব বিএনপিকে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে।

১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করে।

পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনী রাজনীতিতেও বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি আবার সরকার গঠন করে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া একদিকে যেমন সরকার পরিচালনা করেছেন, অন্যদিকে বিরোধী দলে থেকেও আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো, নির্বাচনী রাজনীতি এবং তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় বিস্তারে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় প্রজন্মে তারেক রহমানের উত্থান

বিএনপির রাজনীতিতে তৃতীয় প্রজন্মের নেতৃত্ব হিসেবে তারেক রহমানের উত্থান ঘটে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।

বিএনপির মিডিয়া সেল সূত্রের বরাতে জানা যায়, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তারেক রহমান তার মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে রাজপথের আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে তিনি বগুড়ার গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দেন।

১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন। ১৯৯৩ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়। ওই সম্মেলনে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়।

পরবর্তী সময়ে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করতে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা ইউনিটের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।

২০০২ সালে বিএনপির স্থায়ী কমিটি তাকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে মনোনীত করে। ২০০৫ সালে তিনি দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলন আয়োজন ও বিভিন্ন উপজেলা ইউনিটের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হন।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। পরে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান এবং দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেন।

২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তারেক রহমান। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেও দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আন্দোলন-কর্মসূচি এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন আসে এবং তারেক রহমান দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের হাতে বিএনপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

তিন নেতৃত্বে বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলা

বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসকে মোটাদাগে তিনটি নেতৃত্ব পর্বে ভাগ করা যায়।

জিয়াউর রহমানের সময় ছিল দল প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক দর্শন নির্ধারণ এবং সংগঠনের ভিত্তি নির্মাণের সময়।

খালেদা জিয়ার সময় বিএনপি ব্যাপক গণভিত্তি অর্জন করে, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় এবং একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়।

তারেক রহমানের সময় বিএনপি দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসেছে।

তবে তৃতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের সামনে আগের দুই সময়ের তুলনায় চ্যালেঞ্জের ধরন অনেকটাই ভিন্ন। কারণ এখন বিএনপিকে শুধু রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী দল হিসেবেও নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হচ্ছে।

নির্বাচনী সাফল্যের পর নতুন বাস্তবতা

তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে—এমন বাস্তবতায় দলটির রাজনৈতিক দায়িত্বও বেড়েছে।

দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় সরকারের সমালোচনা করা এবং আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এক ধরনের ভূমিকা। কিন্তু সরকার পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা।

সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনের ওপর। ফলে ক্ষমতায় এসে বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারা কতটা দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে।

সরকার ও দলের মধ্যে ভারসাম্য বড় চ্যালেঞ্জ

ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের জন্য সরকার ও দলীয় সংগঠনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অন্যতম বড় পরীক্ষা।

বিরোধী দলে থাকার সময় দলীয় নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরাসরি মাঠে সক্রিয় থাকেন। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকারি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা রাখার প্রয়োজনীয়তা বাড়ে।

স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রভাব বিস্তার, সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেওয়া, প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ কিংবা দলীয় পরিচয়ে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তৈরি হলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই দলীয় সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা তৈরি করা তারেক রহমানের নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

তৃণমূলে গ্রুপিং ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব

দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষমতায় ফেরার পর পদ-পদবি, প্রভাব, মনোনয়ন ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

একই এলাকায় একাধিক নেতা নিজেদের অনুসারী তৈরি করলে স্থানীয় পর্যায়ে গ্রুপিং বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও জেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে।

এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

পুরোনো ও নতুন নেতৃত্বের সমন্বয়

বিএনপির সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো পুরোনো ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা।

দলের দীর্ঘদিনের নেতাদের রয়েছে আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের নেতাদের রাজনৈতিক চিন্তা, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক জনসম্পৃক্ততার ধরন ভিন্ন।

এই দুই প্রজন্মের শক্তিকে সমন্বিত করে একটি কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা গেলে বিএনপি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হতে পারে।

দলীয় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি

ক্ষমতায় থাকার সময় দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর মানুষের নজর আরও বেশি থাকে। কোনো নেতার ব্যক্তিগত অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় শেষ পর্যন্ত দলের ওপরই বর্তায়।

তাই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা দেখাতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার চ্যালেঞ্জ

বিএনপির নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও জনবান্ধব করা।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, দেশের অর্থনীতি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন খাতকে নতুন করে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

তার মতে, নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে কার্যকর করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালনা করা গেলে জনগণের আস্থা বাড়বে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও।

অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান হবে বড় পরীক্ষার জায়গা

নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোর একটি অর্থনীতি।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত।

বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারলে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখা কঠিন হবে। দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করাও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সংস্কার

জনগণের আস্থা ধরে রাখতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি অপরিহার্য।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

রাজনৈতিক সরকার হিসেবে বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে—দলীয় স্বার্থের বাইরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের স্বার্থে কাজ করছে।

জনসম্পৃক্ততা ধরে রাখাই বড় পরীক্ষা

বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিএনপির অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি ছিল জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই জনসম্পৃক্ততা ধরে রাখা সহজ হবে না।

দ্রব্যমূল্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রে দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে না পারলে মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

ফলে নিয়মিত জনগণের কথা শোনা, মাঠপর্যায়ের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করা সরকারের পাশাপাশি দলীয় সংগঠনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় তরুণদের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সামাজিক নিরাপত্তা—তরুণদের প্রত্যাশার বড় অংশজুড়ে রয়েছে এসব বিষয়।

বিএনপির নতুন নেতৃত্বকে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

৪৮ বছরে বিএনপির সামনে নতুন অধ্যায়

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই শুধু অতীত স্মরণের উপলক্ষ নয়; এটি দলটির সামনে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনাও।

জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি এমন এক সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, যখন জনগণের প্রত্যাশা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

দলটির সামনে একদিকে রয়েছে রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে রয়েছে কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখার দায়িত্ব।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ভবিষ্যৎ সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে দলীয় শৃঙ্খলা, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্বের সমন্বয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর।

সবশেষে বলা যায়, ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলা বিএনপিকে অভিজ্ঞতা দিয়েছে; কিন্তু ক্ষমতায় ফিরে সেই অভিজ্ঞতাকে বাস্তব সুশাসনে রূপ দিতে পারাটাই হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!