বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও টেকসই ও সুদৃঢ় করতে গঙ্গা-তিস্তাসহ অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য বণ্টন এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রাষ্ট্রপতি বলেছেন, অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা শুধু দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি জড়িত। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট এসব বিষয়ে ন্যায়সংগত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান হলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস আরও বাড়বে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে বঙ্গভবনে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন।
গঙ্গা-তিস্তাসহ সব অভিন্ন নদীতে ন্যায্য বণ্টনের আহ্বান
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গঙ্গা ও তিস্তাসহ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অভিন্ন সব নদ-নদীর পানির ন্যায্য বণ্টনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এসব নদীর পানির ওপর উভয় দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কৃষি, জীবিকা, পরিবেশ ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নির্ভরশীল। ফলে নদীর পানি নিয়ে এমন একটি ন্যায়সংগত সমাধান প্রয়োজন, যা দুই দেশের মানুষের স্বার্থকে বিবেচনায় নেয়।
রাষ্ট্রপতি মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা পানিবণ্টনসহ অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয় দ্রুত সমাধান করতে পারলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল হবে।
পানিবণ্টনে ইতিবাচক পদক্ষেপের আশ্বাস ভারতের
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের জবাবে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানান, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে তার সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভারতের আগ্রহের কথা জানান। পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে দুই দেশের বাণিজ্যিক ও সামাজিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার প্রত্যয়ের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর গুরুত্ব
সাক্ষাতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নিকটতম প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেয় বাংলাদেশ।
তবে এ সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে তা সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান নিশ্চিত করা গেলে সম্পর্কের ভিত্তি আরও দৃঢ় হবে। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও যোগাযোগে সহযোগিতা বাড়ানোর তাগিদ
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গতিশীল করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রপতি।
দুই দেশের যৌথ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির মতে, পারস্পরিক স্বার্থের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে উভয় দেশের জনগণই এর সুফল পেতে পারে। বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বহুমাত্রিক করা সম্ভব।
রাষ্ট্রপতিকে ভারতের অভিনন্দন
সৌজন্য সাক্ষাতে নবনিযুক্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারতের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানান হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সামাজিক সম্পর্ক আরও বহুদূর এগিয়ে নিতে ভারতও বদ্ধপরিকর।
দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও সামাজিক যোগাযোগকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন।
সম্পর্কের অমীমাংসিত বিষয় সমাধানে গুরুত্ব
সাক্ষাৎটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্য, যোগাযোগসহ বিভিন্ন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ হয়ে আছে।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে এসব অমীমাংসিত বিষয় আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌম সমতা ও মর্যাদার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সমঝোতা হলে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী, কৃষি ও পরিবেশের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ভারতীয় হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

