ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

জুলাই অভ্যুত্থানের সেই দিন: ডিবি হেফাজতে সমন্বয়কদের দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা ,কারফিউ শিথিল, তবুও থামেনি গণআন্দোলন

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ১১:৪১ এএম

জুলাই অভ্যুত্থানের সেই দিন: ডিবি হেফাজতে সমন্বয়কদের দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা ,কারফিউ শিথিল, তবুও থামেনি গণআন্দোলন

ছবিঃ সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ২৭ জুলাই। টানা সংঘাত, কারফিউ, গণগ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের মধ্যেও ছাত্র-জনতার আন্দোলন থামানো যায়নি। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছয় সমন্বয়ককে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হেফাজতে রেখে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হলেও, আত্মগোপনে থাকা অন্য সমন্বয়করা তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

সেদিন সরকার ১১ ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করে জনমনে স্বাভাবিক পরিস্থিতির বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশি, অভিযান ও গ্রেপ্তার অব্যাহত ছিল। একই সঙ্গে ‘ব্লক রেইড’ নামে পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমে বহু মানুষকে আটক করা হয়।

ডিবি হেফাজতে সমন্বয়কদের দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া। সেখানে তাদের দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা প্রচার করা হয়।

তবে আত্মগোপনে থাকা সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ও হান্নান মাসুদ দাবি করেন, ডিবি হেফাজতে থাকা সমন্বয়কদের ওপর চাপ ও নির্যাতন চালিয়ে এ ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। তারা এটিকে আন্দোলন ভাঙার কৌশল হিসেবে উল্লেখ করে পরদিনই দেশব্যাপী নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। নিহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাব তৎকালীন সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৭ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে সংঘর্ষ ও সহিংসতায় ১৪৭ জন নিহত হন।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলি চালিয়েছে। অন্যদিকে সরকার দাবি করেছিল, জানমাল রক্ষা এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।

নিহতদের পরিবারকে গণভবনে ডাকেন শেখ হাসিনা

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাইদের পরিবারসহ বিভিন্ন পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। নিহতদের স্বজনদের হাতে সঞ্চয়পত্র ও নগদ আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়।

সেই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, "বাংলাদেশকে নিয়ে বারবার খেলা করতে দেওয়া হবে না।" তিনি দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তোলেন। বিএনপির গ্রেপ্তার নিয়ে অভিযোগ একই দিনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, আন্দোলন ঘিরে সারাদেশে দলের ৯ হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং অসুস্থ সিনিয়র নেতাদেরও দীর্ঘ সময় রিমান্ডে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে, যা তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল বলে উল্লেখ করেন।

সরকারের ভিন্ন ব্যাখ্যা সেদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেন, কোটা আন্দোলনের আড়ালে ‘শ্রীলঙ্কা স্টাইলে’ গণভবন দখলের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানমাল রক্ষায় বাধ্য হয়ে গুলি চালিয়েছে।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম দাবি করেন, সহিংসতার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

চালু হয় মোবাইল ইন্টারনেট টানা ১০ দিন বন্ধ থাকার পর সেদিন বিকেল ৩টা থেকে সারাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু করা হয়। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানালেও আন্দোলনকারীরা এটিকে স্বাভাবিক পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে দেখেননি।

আন্দোলনের গতি আরও বাড়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা, কারফিউ শিথিল কিংবা মোবাইল ইন্টারনেট চালুর মতো পদক্ষেপেও ছাত্র-জনতার ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। বরং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয় এবং পরবর্তী সময়ে গণঅভ্যুত্থানের গতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!