দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬’ অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন বেতন কাঠামোয় ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হলেও সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। তবে অনুমোদিত নতুন মূল বেতন একসঙ্গে পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে তিন ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হবে। অন্যদিকে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ সংশ্লিষ্ট ভাতাগুলো নতুন হারে পেতে অপেক্ষা করতে হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত।
সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬ এবং এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।
সরকারের হিসাবে নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী। পাশাপাশি প্রায় সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী এর আওতায় আসবেন। পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো বা এমটিবিএফের (Medium Term Budget Framework) আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোতে এই অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান রাখার কথা জানিয়েছে সরকার।
১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো
২০১৫ সালে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেলের অপেক্ষা ছিল দীর্ঘদিনের। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি কর্মচারীদের পক্ষ থেকে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি ছিল।
নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের ফলে সেই অপেক্ষার অবসান হলো। সরকারের নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। তবে গ্রেডভেদে মূল বেতন বৃদ্ধির হার এক নয়। অপেক্ষাকৃত কম বেতন পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে।
সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতির প্রভাবে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের প্রকৃত আয় বা রিয়েল ওয়েজ তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে কারণে নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে।
সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার টাকা
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো সর্বনিম্ন মূল বেতনের বড় ধরনের বৃদ্ধি।
২০১৫ সালের জাতীয় পে-স্কেলে ২০তম গ্রেডের শুরুর মূল বেতন ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা। নতুন পে-স্কেল-২০২৬-এ তা বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বৃদ্ধির হার প্রায় ১৪২ শতাংশ।
একইভাবে ১৯তম গ্রেডে শুরুর মূল বেতন ৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার ৫০০ টাকা, ১৮তম গ্রেডে ৮ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ২১ হাজার টাকা এবং ১৭তম গ্রেডে ৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২১ হাজার ৪০০ টাকা করা হয়েছে।
১৫ ও ১৬তম গ্রেডেও মূল বেতনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি রাখা হয়েছে।
১৩তম গ্রেডে বেতন ১১ হাজার থেকে ২৪ হাজার
নতুন বেতন কাঠামোয় ১৩তম গ্রেডের শুরুর মূল বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৪ হাজার টাকা হয়েছে।
১৪তম গ্রেডে ১০ হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে।
নিচের গ্রেডগুলোর ক্ষেত্রে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশের বেশি হওয়ায় নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তবে কর্মচারীদের প্রকৃত হাতে পাওয়া অর্থের পরিমাণ নির্ধারণে শুধু নতুন মূল বেতন নয়, ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার
নতুন পে-স্কেলে প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতনও দ্বিগুণ করা হয়েছে।
২০১৫ সালের স্কেলে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ছিল ৭৮ হাজার টাকা। নতুন কাঠামোয় তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
দ্বিতীয় গ্রেডের বেতন ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা এবং তৃতীয় গ্রেডের বেতন ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা করা হয়েছে।
অর্থাৎ সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতনও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। তবে নিচের গ্রেডগুলোর তুলনায় শতাংশের হিসাবে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরাই তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাচ্ছেন।
কোন গ্রেডে কত শতাংশ বেতন বাড়ছে?
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেলে গ্রেডভেদে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ভিন্ন।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী—
১ম থেকে ১১তম গ্রেড: ১০০ শতাংশ
১২তম গ্রেড: ১১৫ শতাংশ
১৩তম গ্রেড: ১১৮ শতাংশ
১৪তম গ্রেড: ১৩০ শতাংশ
১৫ ও ১৬তম গ্রেড: ১৩৫ শতাংশ
১৭তম গ্রেড: ১৩৮ শতাংশ
১৮তম গ্রেড: ১৩৯ শতাংশ
১৯তম গ্রেড: ১৪১ শতাংশ
২০তম গ্রেড: ১৪২ শতাংশ
এর মাধ্যমে সরকার নিম্ন বেতন কাঠামোয় থাকা কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে।
একসঙ্গে নয়, তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অনুমোদিত বেতন কাঠামো কাগজে দ্বিগুণ হলেও কর্মচারীরা একসঙ্গে পুরো সুবিধা হাতে পাবেন না।
মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা হবে।
অর্থাৎ নতুন পে-স্কেলের ঘোষিত অঙ্ক দেখেই কোনো কর্মচারীর বর্তমান বেতন তাৎক্ষণিকভাবে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে—এমনটি নয়।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
নতুন ভাতা পেতে অপেক্ষা ২০২৮ পর্যন্ত
মূল বেতনের পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিভিন্ন ভাতা।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাতাগুলো নতুন হারে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
ফলে নতুন পে-স্কেলের মূল বেতন কার্যকর হওয়ার সময় এবং নতুন হারে ভাতা পাওয়ার সময় এক নয়।
এ কারণে একজন সরকারি কর্মচারীর প্রকৃত বেতন কতটা বাড়বে, সেটি জানতে হলে মূল বেতনের পাশাপাশি ভাতাগুলো কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হবে, সেটিও দেখতে হবে।
নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার
অর্থ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিনের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের অপেক্ষাকৃত স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে মূল বেতন কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের যুক্তি হলো, মূল্যস্ফীতির কারণে কম আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়েছে। তাই নতুন কাঠামোয় তাদের বেতন বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে।
পেনশনেও বড় পরিবর্তন
নতুন পে-স্কেলের সুবিধা শুধু কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামোয় বাড়তি সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিট পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
৯ হাজার টাকা বা কম: ১০০ শতাংশ
৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা: ৭৫ শতাংশ
২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা: ৬৫ শতাংশ
৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা: ৬০ শতাংশ
৪০ হাজার ১ টাকা বা বেশি: ৫৫ শতাংশ
এ ক্ষেত্রেও কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
‘এক পদ এক পেনশন’ এখনই নয়
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির আলোচিত ‘এক পদ এক পেনশন’ বা ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন ব্যবস্থা নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে সঙ্গে চালু হচ্ছে না।
সরকার জানিয়েছে, বিপুল আর্থিক দায় এবং অসামরিক কর্মচারীদের ২০১৯ সালের আগের অবসরসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ঘাটতির কারণে এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
লক্ষ্য রাখা হয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে ব্যবস্থা বাস্তবায়নের।
প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য নতুন ভাতা
নতুন পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আরও একটি নতুন সুবিধা যুক্ত হয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এ ছাড়া মোবাইল ভাতার ক্ষেত্রেও পরিধি বাড়ানো হয়েছে। আগে মূলত পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে সীমিত থাকা মোবাইল ভাতার আওতা এখন সব গ্রেডের কর্মচারীর জন্য সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক স্কেল
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো তৈরির কাজও চলছে।
জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আলাদা স্কেল অনুমোদন করা হবে। জাতীয় পে-স্কেলের মতো সেটিও গত ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর করার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য জাতীয় পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যৌথবাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে।
নতুন পে-স্কেলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় কত?
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, পুরো নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
এ বিশাল অর্থের সংস্থান করা সরকারের জন্য বড় একটি আর্থিক চ্যালেঞ্জ। এজন্য মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, নতুন পে-স্কেলের সুফল ধরে রাখতে হলে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কর্মচারীদের প্রতিক্রিয়া: স্বস্তির পাশাপাশি প্রশ্নও আছে
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সাবেক সভাপতি বেলাল হোসেন নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তার মতে, দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল ঘোষণার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে তিন ধাপে বাস্তবায়নের কারণে কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা ও বাস্তব সুবিধার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
তিনি মনে করেন, একজন কর্মচারীর প্রকৃত বেতন কতটা বাড়ছে তা নির্ধারণ করতে মূল বেতনের পাশাপাশি চাকরির মেয়াদ, ইনক্রিমেন্ট, সার্ভিস বেনিফিট ও বিভিন্ন ভাতা কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে যেসব কর্মচারীর বর্তমান বেতন নতুন স্কেলের কোনো কোনো গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতনের কাছাকাছি বা বেশি, তাদের ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজারে প্রভাব পড়বে কি?
নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আরেকটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়বে কি না।
সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে ভোগব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে নতুন পে-স্কেল যেহেতু একসঙ্গে পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না এবং ভাতাও ২০২৮ সাল থেকে নতুন হারে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাই এর অর্থনৈতিক প্রভাব ধাপে ধাপে পড়তে পারে।
অন্যদিকে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে শুধু বেতন বৃদ্ধিই নয়; উৎপাদন খরচ, জ্বালানি, আমদানি ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা, মুদ্রাস্ফীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ব্যাখ্যা
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি বলেন, গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন পে-স্কেলের মাধ্যমে সেই ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব না হলেও যতটা সম্ভব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে কম আয়ের মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি পড়ে। এ কারণেই নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নতুন পে-স্কেল মূলত নির্ধারিত পে-স্কেলের ওপর নির্ভরশীল সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নিয়েও আলোচনা
নতুন সরকারি পে-স্কেল অনুমোদনের পর বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
বেসরকারি খাতের কর্মীদের বড় একটি অংশও দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছেন।
সামনে বাস্তবায়নের বড় পরীক্ষা
নতুন পে-স্কেল অনুমোদন সরকারের জন্য যেমন একটি বড় সিদ্ধান্ত, তেমনি এর বাস্তবায়নও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর করা, নতুন ভাতার কাঠামো নির্ধারণ, পেনশন পুনর্নির্ধারণ, ইনক্রিমেন্ট ও সার্ভিস বেনিফিট সমন্বয় এবং বিভিন্ন গ্রেডে বেতন নির্ধারণের জটিলতা নিরসনে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন হবে।
অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। সেখানে বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও অবসর-পরবর্তী সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিধান থাকবে।
শেষ কথা
দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় উন্নীত হওয়া নিঃসন্দেহে বড় পরিবর্তন।
তবে নতুন পে-স্কেলের ঘোষিত অঙ্ক আর কর্মচারীর হাতে পাওয়া প্রকৃত বেতন—দুটি বিষয় এক নয়। তিন ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়ন এবং ২০২৮ সালের আগে নতুন হারে ভাতা না পাওয়ার কারণে এর প্রকৃত আর্থিক সুবিধা বুঝতে বাস্তবায়ন বিধিমালা ও প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা করতে হবে।
অন্যদিকে সরকারের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হবে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার বার্ষিক ব্যয় সামলে নতুন কাঠামো কার্যকর করা। রাজস্ব আয়, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সমন্বয় করে পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে পারলেই এর সুফল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে।

