একসময় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ছিল স্থানীয় নেতৃত্ব, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও জনসেবার প্রতিযোগিতা। একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত তার সততা, সামাজিক মর্যাদা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সক্ষমতা। কিন্তু ২০১৬ সালে দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চালুর পর সেই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। স্থানীয় নির্বাচন ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির প্রভাববলয়ে চলে যায়। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে রাজনৈতিক বিভাজন, সহিংসতা, মনোনয়ন বাণিজ্য, মামলা-মোকদ্দমা এবং সামাজিক সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
এবার সরকার দলীয় প্রতীক ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ, সাবেক জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় হারিয়ে যাওয়া ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে তারা বলছেন, শুধু দলীয় প্রতীক বাদ দিলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না; নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক।
২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার আইন সংশোধনের পর ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময় থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলীয় কোন্দল, বিদ্রোহী প্রার্থী, সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্কের অবনতি ঘটতে শুরু করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অনেক জনপ্রতিনিধি জনগণের চেয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ফলে স্থানীয় সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রাধিকার পেতে থাকে।
প্রতীক না থাকলেই কি সহিংসতা কমবে?
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম মনে করেন, শুধু প্রতীক বাদ দিলেই সহিংসতা বন্ধ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো যদি অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী সমর্থন দেয়, তাহলে একই ধরনের সংঘাত আবারও সৃষ্টি হতে পারে।
তার মতে, নির্বাচন যেহেতু নির্দলীয়, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া থেকেও বিরত থাকা উচিত। এ জন্য প্রয়োজন আইনি সংস্কার এবং নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশনা।
দলীয় প্রতীকে কী কী সমস্যা তৈরি হয়েছিল?
স্থানীয় সরকার সংশ্লিষ্টদের মতে, দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে যেসব সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
মনোনয়ন বাণিজ্য ও দলীয় প্রভাব
বিদ্রোহী প্রার্থীকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও প্রাণহানি
ভোটারদের রাজনৈতিক বিভাজন
নির্বাচন-পরবর্তী দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিরোধ
উন্নয়ন প্রকল্পে দলীয় পক্ষপাতের অভিযোগ
জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচনে পিছিয়ে পড়া
‘ভেঙে গিয়েছিল স্থানীয় সরকারের ঐতিহ্য’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর বলেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চালুর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।
তার মতে, প্রতীকবিহীন নির্বাচন হলে মনোনয়ন বাণিজ্য কমবে, সংঘাতও তুলনামূলকভাবে হ্রাস পাবে। তবে কালো টাকা, পেশিশক্তি এবং প্রশাসনিক পক্ষপাত বন্ধ করা না গেলে শুধু প্রতীক বাদ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব হবে না।
জনপ্রিয় প্রার্থীদের সুযোগ বাড়বে
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, দলীয় প্রতীকের বাইরে নির্বাচন হলে স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বাড়বে। ভোটাররাও দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে ব্যক্তি ও কাজের মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে নির্বাচন কালো টাকা, পেশিশক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে।
চেয়ারম্যানদের প্রত্যাশা
বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান-মেম্বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. পয়গাম আলী বলেন, দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন স্থানীয় সরকারের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ। এতে চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং অতীতের অনেক বিতর্ক কমে আসবে।
কেরানীগঞ্জের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, দলীয় প্রতীকের কারণে জনপ্রতিনিধিরা কার্যত দলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিলেন। নির্দলীয় নির্বাচনে সবাই জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
বদলে যাওয়া গ্রামের সমাজ
গ্রামাঞ্চলের অনেক ভোটারের মতে, দলীয় প্রতীক চালুর পর আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এমনকি একই গ্রামের মানুষের মধ্যেও রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে।
কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ী জামাল মিয়া বলেন, প্রতীক না থাকলেও প্রশাসন নিরপেক্ষ না হলে মানুষের আস্থা ফিরবে না।
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল হক বলেন, আগে সমাজ পরিচালনায় শিক্ষক, ইমাম, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ ব্যক্তিদের মতামত গুরুত্ব পেত। পরে অনেক জায়গায় সেই জায়গা দখল করে দলীয় রাজনীতি।
সরকারের অবস্থান
সরকার জানিয়েছে, আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের দাবি, নির্বাচন হবে অংশগ্রহণমূলক, প্রতিযোগিতামূলক এবং যোগ্যতা ও জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতে।
একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী যোগ্য যে কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হলেও নির্বাচন কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা
কালো টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধ করা
ভোটারদের নিরাপদ ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করা
রাজনৈতিক দলের অনানুষ্ঠানিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর নির্বাহী সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি আনুষ্ঠানিক প্রতীক ব্যবহার না করেও একক প্রার্থী ঘোষণা বা সমর্থন দেয়, তাহলে প্রতীকবিহীন নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
ফিরবে কি তৃণমূলের গণতন্ত্র?
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, দলীয় প্রতীক তুলে দেওয়া একটি ইতিবাচক সূচনা হলেও এটি এককভাবে সব সমস্যার সমাধান নয়। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ।
তাদের আশা, যদি নির্বাচন সত্যিকার অর্থে জনগণের ভোটে অনুষ্ঠিত হয়, তবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক দূরত্ব ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকেও গ্রামীণ সমাজ ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে পারবে।

