ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। সময়ের হিসাবে ক্যালেন্ডারের একটি বছর পেরিয়ে গেলেও নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবার, আহত শিশু, শিক্ষক এবং সহপাঠীদের কাছে যেন সময় থমকে আছে ২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের সেই বিভীষিকাময় দুপুরেই।
যে শিশুরা প্রতিদিনের মতো স্কুলে গিয়েছিল, তাদের অনেকেই আর জীবিত ফিরে আসেনি। কেউ হারিয়েছে সন্তান, কেউ ভাই-বোন, কেউ বা সহপাঠী। আর যারা বেঁচে ফিরেছে, তাদের শরীরের ক্ষত শুকালেও মন থেকে মুছে যায়নি সেই ভয়াবহ স্মৃতি।
`যদি জানতাম, আর ফিরবে না...`
নিহত শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার আনিশার স্বজনদের কাছে প্রতিটি দিন এখনও বেদনার। আনিশার মামা লিয়ন মীর বলেন, দুর্ঘটনার আগের দিনগুলো এখনও চোখের সামনে ভাসে।

তিনি বলেন, প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যেত আনিশা। স্কুল শেষে কোচিং, তারপর বাসায় ফিরে পড়াশোনা—এভাবেই কাটত তার দিন। ছোট ভাই ওসমানের জন্য প্রতিদিন নিজের টিফিন থেকে কিছু না কিছু নিয়ে আসত। কখনও বাটার বান, কখনও কেক, কখনও চিপস। খাবার ভাগাভাগি নিয়ে ভাই-বোনের ছোট ছোট ঝগড়াগুলোই এখন পরিবারের সবচেয়ে বড় স্মৃতি।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, "যদি জানতাম সেদিন স্কুলে গিয়ে আর ফিরবে না, কোনোভাবেই তাকে যেতে দিতাম না। আমার নিজের প্রাণ গেলেও দিতাম না।"
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যাওয়ার সময় অলৌকিক কোনো ঘটনার জন্য প্রার্থনা করেছিলেন বলেও জানান তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আনিশাকে জীবিত নয়, চিরবিদায়ের জন্যই গ্রহণ করতে হয়েছে পরিবারকে।
ক্ষতিপূরণ নয়, স্বজনদের দাবি বিচার

দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী মাহতাব রহমানের বাবা মিনহাজ রহমান বলেন, সরকার নিহতদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা এবং আহতদের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিলেও তারা সেই অর্থ গ্রহণ করেননি।
তার ভাষায়, "সন্তানের জীবনের মূল্য কোনো অর্থ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হারিয়ে গেছে। ক্ষতিপূরণ নয়, আমরা চাই সত্য উদঘাটন এবং বিচার।"
তিনি জানান, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়েছে। সেখানে নিহতদের পরিবারকে ৫ কোটি টাকা এবং আহতদের পরিবারকে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
প্রকাশ হোক পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন
স্বজনদের অভিযোগ, তদন্ত কমিশনের পুরো প্রতিবেদন এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
আনিশার মামা লিয়ন মীর বলেন, দুর্ঘটনায় পাইলটের প্রশিক্ষণ, তদারকি এবং স্কুলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়গুলো সামনে এলেও এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। যারা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনাকবলিত পরিবারগুলোর প্রতিনিধিত্বের জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেখানে অনেক নিহত পরিবারের মতামত নেওয়া হয়নি।
`এক ঘণ্টা পর পেয়েছিলাম আমার ছোট বোনকে`
দুর্ঘটনার সময় নিজের ছোট বোনকে খুঁজে না পেয়ে আতঙ্কে ছুটে বেড়ানোর স্মৃতি তুলে ধরে শিক্ষার্থী নিলয় আল নাফি বলেন, ঘটনার সময় তিনি মায়ের সঙ্গে স্কুলের বাইরে ছিলেন।
হঠাৎ বিকট শব্দ ও বিস্ফোরণের পর তারা ভবনের দিকে ছুটে যান। কিন্তু কোথাও ছোট বোনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
তিনি বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা পর গেটের কাছে এসে ছোট বোনকে খুঁজে পান। ঘটনার পর দীর্ঘদিন সে ভয় ও মানসিক ট্রমায় ভুগেছে।
শরীরের ক্ষত শুকিয়েছে, মনের নয়
দুর্ঘটনায় আহত শিক্ষার্থী রুবাইদা নূর আলভীরা এখনও মুখ ও শরীরে সেই দিনের দাগ বহন করছে।
সে জানায়, দুই মাস সাত দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এখন আবার নিয়মিত স্কুলে যায়, তবে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের কথা এখনও ভুলতে পারেনি।
তার ভাষায়, "ভয়কে আঁকড়ে ধরে থাকলে সামনে এগোনো যায় না। কিন্তু যারা আর নেই, তাদের কথা এখনও খুব মনে পড়ে।"
`বন্ধুর হাত ছেড়ে গিয়েছিলাম, আর খুঁজে পাইনি`
আরেক শিক্ষার্থী আশরিফা জান্নাত রাইসা জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি ভবনের নিচতলায় বান্ধবীর হাত ধরে হাঁটছিলেন।
বিকট শব্দে পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। তিনি পড়ে যান। পরে উঠে দেখেন চারদিকে আগুন। কোনোমতে বেরিয়ে এলেও পাশে থাকা বন্ধুকে আর খুঁজে পাননি।
বাইরে এসে কয়েকজনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। এখনও তার দুই হাতে সেই দুর্ঘটনার ক্ষতচিহ্ন রয়েছে।
ট্রমা কাটাতে বিশেষ কাউন্সেলিং
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির কো-অর্ডিনেটর আজমেরি বেগম জানান, দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
তিনি বলেন, প্রায় দুই মাস ধরে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে।
কী ঘটেছিল সেদিন
সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুপুরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফটি-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান নিয়মিত প্রশিক্ষণ ফ্লাইট চলাকালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনের ওপর বিধ্বস্ত হয়।
তদন্তে বিমানটির ইঞ্জিন বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিভিন্ন মানবিক ও অপারেশনাল বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সরকারি হিসাবে এ ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও ৬৪ জন আহত হন। অন্যদিকে বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা ৩৬ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষার্থী। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও।
শ্রদ্ধা ও স্মরণে দুই দিনের কর্মসূচি
প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ দুই দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
এর মধ্যে ছিল দোয়া মাহফিল, নিহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কবর জিয়ারত, এক মিনিট নীরবতা, বিশেষ মোনাজাত এবং দুর্ঘটনাস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের স্মরণে সব শাখায় বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
এক বছর পর আবারও স্কুলের মাঠে শিশুদের হাসি-আনন্দ ফিরে এসেছে। ক্লাস চলছে স্বাভাবিক নিয়মে। কিন্তু আকাশে যখনই কোনো বিমান বিকট শব্দে উড়ে যায়, তখনই অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের মনে ফিরে আসে সেই ভয়াবহ দুপুরের স্মৃতি।
হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের পরিবার বলছে—সময়ের সঙ্গে শোকের রং হয়তো কিছুটা ফিকে হয়, কিন্তু সন্তানের শূন্যতা কখনও পূরণ হয় না। তাদের একটাই দাবি—সত্য প্রকাশ হোক, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হোক এবং এমন ট্র্যাজেডি যেন আর কখনও না ঘটে।

