ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের শঙ্কায় ইউরোপ, বাড়ছে যুদ্ধপ্রস্তুতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ০৯:৫০ এএম

বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের শঙ্কায় ইউরোপ, বাড়ছে যুদ্ধপ্রস্তুতি

ছবিঃ সংগৃহীত

ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী প্রায় ৬৫ মাইল দীর্ঘ সুওয়ালকি করিডোরকে ঘিরে ন্যাটো জোটের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশের সাম্প্রতিক সামরিক মহড়া এবং ইউরোপজুড়ে সাইবার হামলা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও ড্রোন-সম্পর্কিত বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য রুশ আগ্রাসন ও ‘গ্রে জোন’ বা হাইব্রিড কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ।

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদও জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক অবকাঠামো, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থাকে সম্ভাব্য সংকটের জন্য প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ সুওয়ালকি করিডোর?

পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী সুওয়ালকি করিডোর ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। এর একদিকে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ অঞ্চল এবং অন্যদিকে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশ। এই স্থলপথই লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়াকে ন্যাটোর ইউরোপীয় মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে তাই অঞ্চলটি ন্যাটোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সংযোগপথ হিসেবে বিবেচিত। কোনো সংঘাতের পরিস্থিতিতে এই করিডোরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বাল্টিক অঞ্চলের ন্যাটো সদস্যদের সঙ্গে জোটের অন্যান্য অংশের স্থল যোগাযোগ জটিল হয়ে উঠতে পারে।

তবে সুওয়ালকি করিডোরে রাশিয়া বা বেলারুশ সামরিক অভিযান চালাবে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। বরং সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়েই মূলত নিরাপত্তা বিশ্লেষণ চলছে।

বেলারুশের সামরিক মহড়া ঘিরে সতর্কতা

সুওয়ালকি করিডোরের কাছাকাছি বেলারুশের সামরিক তৎপরতা ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। রাশিয়ার সঙ্গে বেলারুশের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক থাকায় মিনস্কের সামরিক কর্মকাণ্ডকে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো, সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পরিবর্তে সীমিত সামরিক চাপ, সাইবার হামলা, নাশকতা, ড্রোন ব্যবহার, তথ্যযুদ্ধ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় আঘাতের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার সম্ভাবনা।

এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অনেক সময় ‘গ্রে জোন’ বা হাইব্রিড অপারেশন হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

‘গ্রে জোন’ হামলা নিয়ে ইউরোপের উদ্বেগ

ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাইবার হামলা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও ড্রোন-সংক্রান্ত নিরাপত্তা ঘটনার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে রুশ গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে হামলা এবং হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার বিষয়টিও ইউরোপীয় নিরাপত্তা আলোচনায় এসেছে।

এসব ঘটনায় পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ হলো—সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করেও প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হতে পারে। রাশিয়া এসব অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে।

ম্যাক্রোঁর সতর্কতা ও ফ্রান্সের প্রস্তুতি

সম্ভাব্য নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় ফ্রান্সও প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ের পর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় বিশেষ পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ইউরোপীয় দেশগুলোকে দেখিয়েছে, আধুনিক সংঘাতে শুধু সামরিক ঘাঁটি বা সীমান্ত সুরক্ষাই যথেষ্ট নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল, পানি সরবরাহ, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামো সচল রাখাও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পোল্যান্ডে বাড়ছে সতর্কতা

রাশিয়ার সম্ভাব্য ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা নিয়েও পোল্যান্ডে সতর্কতা রয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের বিরুদ্ধে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সেটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে।

পোল্যান্ড ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। দেশটির সঙ্গে ইউক্রেন, বেলারুশ এবং রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ অঞ্চলের ভৌগোলিক সম্পর্ক থাকায় যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে দেশটিতে বিশেষ সতর্কতা রয়েছে।

নাগরিকদেরও জরুরি প্রস্তুতির আহ্বান

সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় শুধু সেনাবাহিনী নয়, সাধারণ নাগরিকদের প্রস্তুত রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে ইউরোপে।

কিছু দেশে নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য খাদ্য, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধ, বড় ধরনের সাইবার হামলা, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা কিংবা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে কয়েকদিন নাগরিক সেবা ব্যাহত হলেও মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানো।

যুক্তরাজ্যের সামরিক নেতৃত্বও বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের সবচেয়ে জটিল সময়গুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছে।

জার্মানির হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রস্তুতি

ইউরোপের অন্যতম প্রধান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি জার্মানিও সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে।

দেশটির হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে বড় ধরনের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার আলোকে আহত মানুষের চিকিৎসা, জরুরি সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখার সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মার্জ ইউরোপের স্বাধীনতা ও শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

নিরপেক্ষ সুইজারল্যান্ডও বদলাচ্ছে নিরাপত্তা নীতি

সুইজারল্যান্ড ঐতিহাসিকভাবে নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে আসলেও দেশটি নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের দিকে এগিয়েছে। সম্ভাব্য সশস্ত্র আক্রমণ বা বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটে নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ইউরোপের নিরাপত্তা পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ দেশগুলোর মধ্যেও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও ইউরোপে প্রশ্ন

ইউরোপীয় নিরাপত্তা আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের নিরাপত্তায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র একই সময়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক—একাধিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ নিয়ে সক্রিয় থাকায় ইউরোপের কিছু দেশের মধ্যে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পোল্যান্ডে স্থায়ী মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন। তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি বড় অংশ একই সঙ্গে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ বদলে দিয়েছে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ভাবনা

ইউক্রেনে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইউরোপের সামরিক পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন এনেছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আধুনিক সংঘাতে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি পুরো রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোকে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়।

বিদ্যুৎ সরবরাহ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, রেলপথ, হাসপাতাল, খাদ্য সরবরাহ, সাইবার নেটওয়ার্ক ও জরুরি সেবাগুলো সচল রাখা তাই প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে।

ন্যাটোও সংকটকালে জাতীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। লক্ষ্য হচ্ছে কোনো সামরিক বা হাইব্রিড হামলার পরও সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ও গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা যতটা সম্ভব সচল রাখা।

ন্যাটোর জন্য বড় পরীক্ষা সুওয়ালকি করিডোর?

সুওয়ালকি করিডোরকে ঘিরে ইউরোপের উদ্বেগ মূলত এর কৌশলগত অবস্থানের কারণে। বাল্টিক দেশগুলোকে ন্যাটোর মূল ইউরোপীয় ভূখণ্ডের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত রাখার ক্ষেত্রে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো সংঘাতের পরিস্থিতিতে এই যোগাযোগপথ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হলে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে—এমন বিশ্লেষণ রয়েছে।

তবে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবং জোটের নেতৃত্ব বারবার জানিয়েছে, কোনো সদস্য দেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলা হলে তা জোটের সম্মিলিত নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হবে।

যুদ্ধের আশঙ্কা নয়, প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর বার্তা

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পদক্ষেপকে সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে দেখার পাশাপাশি সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে মূল লক্ষ্য হচ্ছে—সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে এমন বার্তা দেওয়া যে সামরিক হামলা, সাইবার আক্রমণ বা হাইব্রিড কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা সহজে দুর্বল করা সম্ভব হবে না।

সুওয়ালকি করিডোর ঘিরে সামরিক ও কূটনৈতিক উদ্বেগ তাই শুধু একটি সীমান্ত এলাকার বিষয় নয়। এটি ইউরোপের প্রতিরক্ষা কাঠামো, ন্যাটোর সম্মিলিত নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পর বদলে যাওয়া ইউরোপীয় নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তথ্যসূত্র: CNN

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!