ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

বাজারে মিলছে না অত্যাবশ্যকীয় ১১৭ ওষুধ, বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ১২:০৫ পিএম

বাজারে মিলছে না অত্যাবশ্যকীয় ১১৭ ওষুধ, বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের বাজারে সরকার নির্ধারিত অত্যাবশ্যকীয় ১১৭টি ওষুধের বেশিরভাগই বর্তমানে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রযুক্তির পরিবর্তনে কিছু ওষুধের চাহিদা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের সংকট এবং দীর্ঘদিন মূল্য সমন্বয় না হওয়ার কারণে তালিকাভুক্ত বেশ কিছু ওষুধের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে বিকল্প ও তুলনামূলক ব্যয়বহুল ওষুধ কিনতে হচ্ছে রোগীদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সরবরাহ ও মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বাস্তবে সরকারি হাসপাতাল থেকে শুরু করে খুচরা বাজার—বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট দেখা দেওয়ায় চিকিৎসার ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে বাজারে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকর তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সরকারি হাসপাতালেও মিলছে না সব ওষুধ

রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে পা ব্যথার চিকিৎসা নিতে আসেন রিকশাচালক আমির আলী। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ভিটামিনের ওষুধ বিনামূল্যে পেলেও প্রয়োজনীয় ব্যথার ওষুধ পাননি তিনি। ফলে বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।

আমির আলীর ভাষ্য, হাসপাতাল থেকে বেশিরভাগ ওষুধ পেলেও দুটি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। বাইরে ওষুধ কিনতে গেলে আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা গাড়িচালক মেহেদীর অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো হাসপাতাল থেকে পাওয়া গেলে তার জন্য অনেক সুবিধা হতো। কিন্তু বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে গেলে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তিনি উদ্বিগ্ন।

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত ওষুধ কিনতে হওয়ায় সংকটটি আরও প্রকট হচ্ছে।

কেন বাজার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ?

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার উদ্দেশ্যে সরকার ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু গত তিন দশকে ওষুধ উৎপাদন প্রযুক্তি, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং রোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

বাজারে এসেছে নতুন প্রজন্মের ওষুধ, নতুন ফর্মুলেশন এবং বিভিন্ন বিকল্প ব্র্যান্ড। ফলে পুরোনো তালিকায় থাকা কিছু ওষুধের চাহিদা কমেছে। আবার কোনো কোনো ওষুধের ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত দামে তা বাজারজাত করা উৎপাদকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফলে কিছু কোম্পানি এসব ওষুধ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারের সরবরাহে।

রাজধানীর এক ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, পুরোনো তালিকার বেশ কিছু ওষুধ এখন নিয়মিত পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ওষুধের বিকল্প ব্র্যান্ড পাওয়া গেলেও নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের সরবরাহ অনিয়মিত। কাঁচামালের সংকটকেও অনেক সময় সরবরাহ ঘাটতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় উৎপাদনে অনাগ্রহ

ওষুধের বাজারে আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের দাম, জ্বালানি, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে গেলেও সব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সেই অনুযায়ী সমন্বয় হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুলের মতে, নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর ওষুধের দাম পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে দাম সমন্বয় না হলে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো কম দামের পুরোনো ওষুধ উৎপাদনের পরিবর্তে তুলনামূলক বেশি দামের নতুন ওষুধ উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।

এর ফলে একদিকে বাজারে পুরোনো অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সরবরাহ কমে যায়, অন্যদিকে রোগীদের বিকল্প হিসেবে তুলনামূলক বেশি দামের ওষুধ কিনতে হয়।

দাম কম রাখলেও তৈরি হতে পারে সংকট

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা যেমন জরুরি, তেমনি উৎপাদন খরচের বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেনের মতে, প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে কোনো কোনো পুরোনো ওষুধের উৎপাদন ব্যয় কমে আসতে পারে। স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে শ্রম ব্যয়ও কমেছে। ফলে সব ওষুধের দাম একই হারে বাড়ানোর প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে কাঁচামাল, জ্বালানি বা অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কিছু ওষুধের দাম পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজন হতে পারে। বাজার বাস্তবতা বিবেচনা না করে দীর্ঘদিন একই দাম ধরে রাখলে উৎপাদকরা ওই ওষুধ উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন। তখন বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে।

অর্থাৎ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণে রোগীর ক্রয়ক্ষমতা ও উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।

বিকল্প ওষুধে বাড়ছে রোগীর খরচ

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে রোগীদের ওপর। নির্দিষ্ট ওষুধ বাজারে না থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিকল্প ব্র্যান্ড বা তুলনামূলক বেশি দামের ওষুধ কিনতে হয়।

বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষদের ক্ষেত্রে এ ব্যয় চিকিৎসা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অনেক রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধের পুরো কোর্স শেষ না করে মাঝপথে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধের দাম ও প্রাপ্যতা সরাসরি চিকিৎসাসেবার কার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার পরও যদি রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে না পারেন, তাহলে পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

WHO-এর নীতিতেও গুরুত্ব পেয়েছে সাশ্রয়ী ওষুধ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে WHO-এর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় শত শত ওষুধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা জনগণের কাছে সহজলভ্য থাকে।

বাংলাদেশেও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ দীর্ঘদিনের। তবে সময়ের সঙ্গে রোগের ধরন, চিকিৎসা প্রযুক্তি, ওষুধ উৎপাদন পদ্ধতি এবং বাজার কাঠামো পরিবর্তিত হওয়ায় পুরোনো তালিকা ও মূল্য কাঠামো নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরও বেশি সংখ্যক ওষুধের দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ওষুধের পেছনে বড় অংশের স্বাস্থ্য ব্যয়

বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের একটি বড় অংশ রোগীদের নিজেদের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। ওষুধ কেনার ব্যয় এই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের অন্যতম প্রধান অংশ।

ডা. মোশতাক হোসেনের মতে, একজন মানুষের নিজের পকেট থেকে যে চিকিৎসা ব্যয় হয়, তার বড় একটি অংশ ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চলে যায়। ফলে ওষুধের দাম ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।

স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য সহজলভ্য করতে হলে শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজনীয় ওষুধও সুলভ মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে।

প্রয়োজন নিয়মিত গবেষণা ও বাজার তদারকি

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিন দশক আগের তালিকা ও মূল্য কাঠামোর ওপর নির্ভর করে বর্তমান ওষুধের বাজার পরিচালনা করা যথেষ্ট নয়। কোন ওষুধের চাহিদা বেড়েছে, কোনটির চাহিদা কমেছে, কোন ওষুধের উৎপাদন ব্যয় কত, কোন ওষুধ বাজার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এবং কোন বিকল্প ওষুধের দাম কত—এসব তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত গবেষণা ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে উৎপাদক, আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কোনো প্রয়োজনীয় ওষুধ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অপ্রাপ্য করা হচ্ছে কি না, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কি না এবং উৎপাদন বন্ধের প্রকৃত কারণ কী—এসব বিষয়ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার।

রোগীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি

ওষুধের বাজারে একদিকে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা—দুই বিষয়কেই বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত নীতি প্রণয়ন জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সময়োপযোগী করা, চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন নিশ্চিত করা, যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ বাড়ানো এবং বাজারে নিয়মিত অভিযান ও তদারকি—এই পাঁচটি বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

কারণ প্রয়োজনের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ বাজারে না পাওয়া শুধু ভোক্তার অসুবিধা নয়; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ওষুধের বাজারে সরবরাহ, মূল্য ও মান—তিন ক্ষেত্রেই কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!