ইতালির ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে মারধর ও হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি। এ ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাঁধনের দাবি, ভেনিসের একটি পার্কে ভাই ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অবস্থান করার সময় একদল বাঙালি তাকে ঘিরে ধরে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করেন। এ সময় তার দিকে পানি ও কোমল পানীয় ছুড়ে মারা হয়, তার ফোন ফেলে দেওয়া হয় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়।
‘জুলাই যোদ্ধা’ বলে হেনস্তার অভিযোগ
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে হামলাকারীদের একজন বাঁধনকে দেখিয়ে তাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে উল্লেখ করতে শোনা যায়। একই ভিডিওতে ওই ব্যক্তি নিজেদের ‘ভেনিস ছাত্রলীগ’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বাঁধনকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা তাকে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্লোগান দিতে চাপ দেন। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে বাধ্য করার চেষ্টা এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের অভিযোগও করেন তিনি।
লাইভে ঘটনার বর্ণনা
সোমবার মধ্যরাতে ফেসবুক লাইভে এসে বাঁধন বলেন, তিনি তার ভাইয়ের সঙ্গে একটি পার্কে গিয়েছিলেন। সেখানে কয়েকজন বাঙালি এসে তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেন।
বাঁধনের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা তার শরীরে পানি ও কোমল পানীয় ছুড়ে মারেন। এ সময় তিনি সম্পূর্ণ ভিজে যান। তার সঙ্গে থাকা ভাইয়ের ছোট শিশুটিও ঘটনাস্থলে ছিল বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, তার গায়ে হাত তোলা হয়েছে, ফোন ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং কানের কাছেও আঘাত করা হয়েছে। ঘটনার পর তাকে আতঙ্কিত ও আহত অবস্থায় দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও লাইভের দৃশ্যেও তার মুখে আঘাতের চিহ্ন এবং অস্বস্তির ছাপ দেখা গেছে।
‘হ্যাঁ, আমি জুলাই যোদ্ধা’
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বাঁধন নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
বাঁধনের ভাষ্য, হামলাকারীরা তাকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলে আখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে পরিচয় দেন। রাজনৈতিক স্লোগান দিতে বাধ্য করার চেষ্টা এবং তা ভিডিও করার ঘটনাকে তিনি পরিকল্পিত হেনস্তা হিসেবে দেখছেন।
ভেনিসে চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়েছিলেন বাঁধন
বাঁধন বর্তমানে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসরে অংশ নিতে ইতালিতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত একটি চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি উৎসবে অংশ নিয়েছেন।
লাইভে বাঁধন বলেন, আওয়ামী লীগের কর্মীরা হয়তো জানেন না যে তিনি বাংলাদেশ থেকে যে সিনেমাটি নিয়ে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে এসেছেন, সেটির পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন। নির্মাতার পারিবারিক পরিচয়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের পরও তিনি ওই নির্মাতার সঙ্গে কাজ করেছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে যে আচরণ করা হয়েছে, সেটিকে তিনি সমর্থনযোগ্য মনে করেন না।
‘এ ধরনের আচরণ থেকে বেরিয়ে আসা উচিত’
ঘটনার পর হামলাকারীদের উদ্দেশে বাঁধন বলেন, এ ধরনের অসংলগ্ন আচরণ থেকে তাদের বের হয়ে আসা উচিত ছিল। নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনের জন্য এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অভিনেত্রীর অভিযোগ, ঘটনাটি শুধু তাকে ব্যক্তিগতভাবে হেনস্তা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাকে রাজনৈতিকভাবে অপদস্থ করার উদ্দেশ্যেও ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা হয়েছে।
থানায় অভিযোগের খবর
এ ঘটনার পর বাঁধন ভেনিসের একটি থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একজন শিল্পী বিদেশের মাটিতে এমন হেনস্তার শিকার হওয়ায় অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে হামলার অভিযোগ
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় রাজপথে সক্রিয় ছিলেন আজমেরী হক বাঁধন। ওই সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে কথা বলেন তিনি। তার সেই রাজনৈতিক অবস্থান ও আন্দোলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ্য।
বাঁধনের অভিযোগ, সেই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই ভেনিসে তাকে টার্গেট করা হয়েছে। তবে হামলার পেছনে কারা সরাসরি জড়িত এবং ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে হামলাকারীদের পরিচয় ও বক্তব্যের যে দাবি উঠে এসেছে, সেটিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে যাচাই করার বিষয়। অভিযোগের সত্যতা ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

