ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

সালমান শাহ হত্যা মামলা: সামীরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন ২৯ সেপ্টেম্বর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম

সালমান শাহ হত্যা মামলা: সামীরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন ২৯ সেপ্টেম্বর

ছবিঃ সংগৃহীত

চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত। রোববার (৩০ আগস্ট) তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারিত থাকলেও তা জমা দিতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রোর দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় আদালত আগামী ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘদিনের রহস্য

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহকে। তার প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। মৃত্যুর সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তুমুল জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন তিনি।

সালমান শাহর মৃত্যুর পর প্রথমে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যু মামলা করেন। তবে পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে তিনি মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান।

১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই করা ওই আবেদনের পর আদালত ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দেয়। পরে সিআইডি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে ওই তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর বাবা রিভিশন মামলা করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তেও যায়।

বিচার বিভাগীয় তদন্তেও হত্যার প্রমাণ মেলেনি

২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান। প্রায় ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেই প্রতিবেদনেও সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

এরপর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ১১ জনের নাম উল্লেখ করে তাদের ছেলের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি আরও তদন্তের দাবি জানান।

পরবর্তী সময়ে মামলাটি র‌্যাবের কাছে তদন্তের জন্য যায়। তবে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত র‌্যাবকে তদন্ত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এরপর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

পিবিআইয়ের তদন্তেও আত্মহত্যার কথা বলা হয়

প্রায় চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্তে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ও সংশ্লিষ্ট ৫৪ জনের জবানবন্দি, বিভিন্ন আলামত এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করার কোনো প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি। বরং পারিবারিক কলহ ও ব্যক্তিগত মানসিক চাপের কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে ওই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট হননি সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে তিনি আরও তদন্তের দাবি জানিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যান।

২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।

নতুন করে হত্যা মামলা

পরবর্তীতে সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। ২০২২ সালের ১২ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত রিভিশন আবেদন গ্রহণ করেন। তবে বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ সময় এর শুনানি হয়নি।

এরপর গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মায়ের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন।

আদালত সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরীর অভিযোগ এবং ঘটনায় সংশ্লিষ্ট রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দিসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে হত্যা মামলার অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন।

আদালতের নির্দেশের পর রমনা মডেল থানা পুলিশকে মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্তের দায়িত্ব সিআইডির কাছে আসে।

সামীরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে করা অভিযোগে তার সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, এজাহারভুক্ত আসামিসহ অজ্ঞাতনামা পলাতক ব্যক্তিরা পরস্পর যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহকে হত্যা করেন।

তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তদন্ত শেষে সিআইডি কী তথ্য-প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপন করে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গ্রেপ্তার ডনকে ঘিরেও তদন্ত

মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং ওই দিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

১২ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালত তার জামিন আবেদন নাকচ করেন। পরে মামলার তদন্তের স্বার্থে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন কোনো তথ্য সামনে আসে কি না, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে।

২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনের দিকে নজর

সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও তার মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—এ নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি। একাধিক তদন্তে আত্মহত্যার কথা উঠে এলেও পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ করে আইনি লড়াই অব্যাহত রাখা হয়েছে।

এ অবস্থায় সিআইডির নতুন তদন্ত প্রতিবেদন মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারিত থাকায় সেদিনের দিকে নজর রয়েছে সালমান শাহর পরিবার, ভক্ত ও সংশ্লিষ্ট মহলের।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!