ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহের মৃত্যুর ২৯ বছর পর তাঁর মৃত্যুরহস্যের তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। দীর্ঘদিনের বিতর্কের মধ্যে হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁর গ্রেপ্তারের পর সালমান শাহের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে—দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর উত্তর এবার তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে।
তবে সালমান শাহের মৃত্যুকে ঘিরে হত্যা, আত্মহত্যা ও পূর্বপরিকল্পিত হত্যার যে বিভিন্ন দাবি এতদিন সামনে এসেছে, সেগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন। ফলে তদন্তে পাওয়া তথ্য, আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই ঘটনার বিভিন্ন দিক যাচাই করা হচ্ছে।
ডন গ্রেপ্তারে তদন্তে নতুন গতি
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডির একটি সূত্র জানিয়েছে, সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। মামলার অন্য আসামিদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তাঁদের মধ্যে সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা হকের নামও রয়েছে।
আদালতে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করেন সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আরিফুর রহমান। আদালতে তিনি দাবি করেন, বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী এজাহারভুক্ত অন্য আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার কারণে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলেও তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান।
তবে শুনানি শেষে আদালত ডনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সিআইডির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও সংস্থাটির প্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনও জানিয়েছেন, একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি নিয়ে কাজ করছেন।
১২ লাখ টাকার বিনিময়ে হত্যার অভিযোগ
ডনকে ঘিরে মামলার অভিযোগে উঠে এসেছে আরও গুরুতর কিছু তথ্য। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী আদালতে দাবি করেন, মামলার এক আসামি রেজভী আহমেদ ওরফে ফারহাদের জবানবন্দিতে ডনের সঙ্গে সামিরা হকের কথিত সম্পর্কের বিষয়টি এসেছে।
ওই জবানবন্দির বরাত দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ডন, ফারুক ও রেজভী আহমেদ ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে সালমান শাহকে অচেতন করা হয় এবং পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখাতে তাঁকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
তবে এসব অভিযোগ তদন্তাধীন এবং আদালতে এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। তদন্তে জবানবন্দি, পারিপার্শ্বিক তথ্য, আলামত ও অন্যান্য নথি যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা হবে।
পরিবারের দীর্ঘদিনের দাবি—আত্মহত্যা নয়, হত্যা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনে নিজ বাসা থেকে সালমান শাহের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর জন্মনাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই চলচ্চিত্রে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করা এই নায়কের আকস্মিক মৃত্যু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
মৃত্যুর পর তাঁর বাবা কমর উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। কিন্তু শুরু থেকেই পরিবারের একাংশের দাবি ছিল, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি; তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে এই দাবিতে আইনি লড়াই চালিয়ে যান। পরিবারের অভিযোগ ছিল, মৃত্যুর ঘটনাটি যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়নি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে সত্য আড়াল হয়েছে।
একাধিক তদন্তে উঠে এসেছিল আত্মহত্যার তথ্য
সালমান শাহের মৃত্যুর পর এ নিয়ে একাধিক তদন্ত হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।
এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তাঁর বাবা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। প্রায় ১২ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট ওই তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে। সেখানেও সালমান শাহের মৃত্যুকে অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এরপর ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল নীলা চৌধুরী আবারও আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআইকে নির্দেশ দেন।
২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনের সিদ্ধান্ত ছিল, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবেদনে তাঁর আত্মহত্যার পেছনে কয়েকটি কারণও উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তও মেনে নেয়নি সালমান শাহের পরিবার। ২০২১ সালের অক্টোবরে নীলা চৌধুরীর পক্ষ থেকে ওই তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করা হয়। আবেদনে অভিযোগ করা হয়, যথাযথভাবে তদন্ত না করেই প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে এবং আসামিদের প্রভাবের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
আদালতের নির্দেশে হত্যা মামলা
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে রমনা থানাকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরদিন রমনা থানায় মামলাটি করা হয় বলে মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে জানা যায়। মামলায় সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা হকসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—সামিরা হকের মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবি, এ. সাত্তার, সাজু এবং রেজভী আহমেদ ওরফে ফারহাদ।
মামলার পর আসামিরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়ার কথাও জানানো হয়।
গৃহকর্মীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
সালমান শাহের মামা আলমগীর কুমকুম বলেছেন, ডন গ্রেপ্তার হওয়ায় তাঁরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে তাঁর দাবি, সালমান শাহের বাসার গৃহকর্মী আবুল, মনোয়ারা ও ডলিও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারেন। তাঁদের ঘটনার সময় বাসায় উপস্থিত থাকার দাবি করে তিনি বলেন, তাঁদের পুলিশ যথাযথভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।
আলমগীর কুমকুম আরও দাবি করেন, গৃহকর্মী আবুলের গ্রামের বাড়িতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন—এই অর্থের উৎস কী। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ছাড়া এগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সালমান শাহের স্বজনদের দাবি, মামলার সব আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে যেসব ব্যক্তির নাম মামলায় এসেছে, তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তে আলাদাভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
১৯৯৭ সালের অপহরণ মামলার প্রসঙ্গও সামনে
সালমান শাহের ছোট ভাইকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে ১৯৯৭ সালে ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা হয়েছিল বলেও আদালতে উল্লেখ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। এই মামলার তথ্যও বর্তমান তদন্তে কোনোভাবে প্রাসঙ্গিক কি না, সেটি খতিয়ে দেখার বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তে পুরোনো মামলার নথি, আসামিদের জবানবন্দি, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক তথ্য, ঘটনার সময়কার চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তসংক্রান্ত নথি এবং পূর্ববর্তী তদন্ত প্রতিবেদনগুলো পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে।
২৯ বছর পরও যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি
সালমান শাহের মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর নতুন করে হত্যা মামলা তদন্ত শুরু হওয়ায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। আগের তদন্তে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি কী ছিল, নতুন মামলায় হত্যার অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে, আগের তদন্তের সঙ্গে বর্তমান তদন্তের পার্থক্য কোথায় এবং নতুন তদন্তে যেসব অভিযোগ উঠেছে সেগুলোর প্রমাণ কতটা শক্ত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
একই সঙ্গে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, আগের একাধিক তদন্তের সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিবারের দাবির বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ফলে নতুন তদন্তে কোনো পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সব পক্ষের বক্তব্য, নথি ও আলামত যাচাই করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তদন্তের ফলের দিকে তাকিয়ে পরিবার ও ভক্তরা
সালমান শাহের মৃত্যুর পর ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শকের কাছে তিনি এখনো ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় নায়ক।
দীর্ঘ সময় পর হত্যা মামলায় একজন আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর মৃত্যুরহস্য। পরিবার চাইছে, তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটিত হোক এবং অভিযোগের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক।
তবে শেষ পর্যন্ত সালমান শাহের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল—হত্যা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো ঘটনা—তার উত্তর নির্ধারণ করবে তদন্তের প্রমাণ ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া। ২৯ বছরের পুরোনো এই রহস্যের পর্দা এবার সত্যিই ওঠে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

