ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

অনাহার, ফুটপাতে হকারি, সিনেমার টিকিট বিক্রি—সংগ্রামের সেই দিন পেরিয়ে বাংলা গানের স্বতন্ত্র গীতিকার মারজুক রাসেল

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ১৭, ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম

অনাহার, ফুটপাতে হকারি, সিনেমার টিকিট বিক্রি—সংগ্রামের সেই দিন পেরিয়ে বাংলা গানের স্বতন্ত্র গীতিকার মারজুক রাসেল

ছবিঃ সংগৃহীত

কখনো অনাহার, কখনো ফুটপাতে হকারি, কখনো সিনেমার টিকিট বিক্রি—জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করেই পথচলা শুরু হয়েছিল তাঁর। থাকার জায়গা ছিল না, ছিল অনিশ্চয়তা; তবু শব্দের প্রতি টান কখনো হারিয়ে যায়নি। অভাবের মধ্যেও কবিতা লিখেছেন, গান লিখেছেন। সময়ের সঙ্গে সেই শব্দই তাঁকে এনে দিয়েছে পরিচিতি, জনপ্রিয়তা ও স্বতন্ত্র এক অবস্থান।

তিনি মারজুক রাসেল—কবি, গীতিকার, অভিনেতা ও মডেল। তবে বহুমাত্রিক পরিচয়ের মধ্যেও তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় গীতিকার হিসেবে। বাংলা গানের প্রচলিত শব্দভাণ্ডারের বাইরে গিয়ে নাগরিক জীবন, প্রেম, বিরহ, নিঃসঙ্গতা, উন্মাদনা ও ব্যক্তিগত অনুভূতিকে নিজের মতো করে গানের কথায় তুলে ধরার জন্য তিনি আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন।

শৈশবেই শব্দের সঙ্গে সম্পর্ক

গোপালগঞ্জে জন্ম হলেও মারজুক রাসেলের শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় কেটেছে খুলনার দৌলতপুরে। পড়াশোনার সময় থেকেই লেখালেখির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘জনবার্তা’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। তখন তিনি মাদ্রাসার ছাত্র।

সেই বয়সেই লেখালেখির প্রতি যে টান তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী জীবনে সেটিই তাঁর পথের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। জীবন যত কঠিন হয়েছে, শব্দের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তত গভীর হয়েছে।

১৯৯৩ সালে ঢাকায়, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

১৯৯৩ সালে জীবনের মোড় ঘোরানোর প্রত্যয়ে খুলনা থেকে ঢাকায় আসেন মারজুক। স্বপ্ন ছিল লেখালেখিকে ঘিরে, কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। রাজধানীতে এসে তাঁকে জীবিকার জন্য নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে।

একসময় তোপখানা রোডের একটি গাড়ির গ্যারেজেও থাকার কথা জানা যায়। বেঁচে থাকার তাগিদে সিনেমার টিকিট বিক্রি করেছেন, ফুটপাতে হকারি করেছেন। পরে একটি কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠানে কাজও করেছেন।

কিন্তু জীবিকার সংগ্রাম তাঁকে লেখালেখি থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখার ভাষা ও ভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হয়।

আজিজ মার্কেট থেকে বদলে গেল পথ

ঢাকায় আসার পর আজিজ মার্কেট হয়ে ওঠে তাঁর লেখকজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। সেখানে তরুণ লেখক, কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে পরিচয় বাড়তে থাকে। কবিতা ও গল্পের পাশাপাশি গান লেখার দিকেও মনোযোগ দেন তিনি।

ফারুক মামুনের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমে কাজের সুযোগ পান। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। এই সময়েই তাঁর পরিচয় হয় সংগীতশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর সঙ্গে।

মারজুকের লেখা পড়ে সঞ্জীব চৌধুরী তাঁকে নগরবাউল জেমসের সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দেন। সেই পরিচয়ই পরবর্তী সময়ে তাঁর গীতিকারজীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে।

জেমসের সঙ্গে পরিচয়, গীতিকার হিসেবে উত্থান

জেমসের সঙ্গে পরিচয়ের সময় ‘লেইস ফিতা লেইস’ অ্যালবামের কাজ চলছিল। মারজুকের লেখা পড়ে তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হন জেমস। এরপর শুরু হয় দুজনের দীর্ঘ সৃজনশীল পথচলা।

জেমসের কণ্ঠে মারজুক রাসেলের লেখা একের পর এক গান শ্রোতাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। ‘মীরা বাঈ’, ‘পত্র দিও’, ‘শরাবে শরাব’, ‘হা ডু ডু’, ‘আমি ভাসব যে জলে, তোমায় ভাসাবো সেই জলে’, ‘দে দূরে’, ‘বাইসকুপের খেলা’, ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’, ‘হাউজি’ ও ‘তেরো নদী সাত সমুদ্র’—এ ধরনের গানে তাঁর নিজস্ব শব্দচয়ন ও ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়।

এসব গানের মাধ্যমে শুধু গানই জনপ্রিয় হয়নি, গীতিকার হিসেবেও মারজুক রাসেলের নাম প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। বিশেষ করে বাংলা ব্যান্ডসংগীতের শ্রোতাদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আলাদা ঘরানার এক গীতিকার।

জেমসের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃত গীতিকর্ম

মারজুকের গীতিকর্ম জেমসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশের জনপ্রিয় আরও অনেক শিল্পীর কণ্ঠে তাঁর লেখা গান শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে।

আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে’, ‘ললনা’, ‘তোমার চোখে দেখলে বন্ধু’—এসব গানেও তাঁর স্বতন্ত্র শব্দচয়ন ফুটে উঠেছে।

পান্থ কানাইয়ের ‘গোল্লা’, ইশান কোণের ‘বায়ু’, আসিফ আকবরের ‘ও আমার পাগলা ঘোড়া রে’, ‘সবার বাংলাদেশ’, ‘তুমি হারিয়ে যাওয়ার সময় আমায় সঙ্গে নিও’, ‘নারী’, ‘বদলে’, ‘মিল’, ‘মাইথ’, ‘জলকন্যা’ ও ‘ফুঁ’সহ বিভিন্ন গানে তাঁর গীতিকর্মের বিস্তৃতি দেখা যায়।

হাবিব ওয়াহিদের ‘দ্বিধা’ গানটিও তাঁর বহুল পরিচিত কাজগুলোর একটি। আরেফিন রুমির ‘দোলনা’ও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য গীতিকর্মের তালিকায়।

প্রচলিত ভাষার বাইরে নিজস্ব এক জগৎ

মারজুক রাসেলের গীতিকবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাঁর শব্দ ব্যবহারের স্বাতন্ত্র্য। তিনি গানের কথায় কখনো সরল প্রেমকে তুলে ধরেছেন, কখনো ব্যবহার করেছেন অপ্রচলিত উপমা; কখনো নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা, কখনো ব্যক্তিগত অনুভূতি, আবার কখনো জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

তাঁর গানের ভাষা অনেক সময় কথ্য, আবার কখনো কাব্যিক। ফলে শ্রোতার কাছে তা একই সঙ্গে পরিচিত ও নতুন মনে হয়। প্রচলিত প্রেম-বিরহের গানের বাইরে গিয়ে জীবনকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতাই তাঁর লেখাকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

কবিতাতেও নিজস্ব অবস্থান

গীতিকার হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার আগেই কবি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন মারজুক রাসেল। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শান্টিং ছাড়া সংযোগ নিষিদ্ধ’ প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে।

পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয় ‘চাঁদের বুড়ির বয়স যখন ষোলো’, ‘বাঈজি বাড়ি রোড’ ও ‘ছোট্ট কোথায় টেনিস বল’। দীর্ঘ বিরতির পর প্রকাশিত হয় ‘দেহবণ্টনবিষয়ক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর’ এবং ‘হাওয়া দেখি, বাতাস খাই’।

তাঁর কবিতাতেও দেখা যায় প্রচলিত কাঠামোর বাইরে যাওয়ার প্রবণতা। শব্দ, ভাবনা ও নাগরিক বাস্তবতার মিশেলে তিনি নিজের একটি আলাদা কাব্যভাষা তৈরি করেছেন।

অভিনয়েও সফল উপস্থিতি

মারজুক রাসেলের সৃজনশীলতার পরিধি কবিতা ও গানে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ব্যাচেলর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হয় তাঁর।

এরপর ‘মেড ইন বাংলাদেশ’, ‘রাত্রীর যাত্রী’, ‘সাপলুডু’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি টেলিভিশন নাটক, বিজ্ঞাপন ও মিউজিক ভিডিওতেও তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের নজর কেড়েছে।

অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তাঁর স্বাভাবিক ও নিজস্ব উপস্থাপনভঙ্গি তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

সংগ্রামই কি তাঁর শব্দের শক্তি?

মারজুক রাসেলের জীবনকাহিনি শুধু একজন কবি বা গীতিকারের সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের সৃজনশীল পরিচয় ধরে রাখার গল্প।

জীবনের এক পর্যায়ে অনাহার, অনিশ্চয়তা ও নানা ধরনের কাজের মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হয়েছে তাঁকে। এমনকি কবি শামসুর রাহমানের কাছে সাহায্যের আশায় যাওয়ার মতো কঠিন সময়ও তাঁর জীবনে এসেছে বলে বিভিন্ন সময়ের বর্ণনায় উঠে এসেছে।

কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর লেখাকে দিয়েছে বাস্তবতার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ। তাঁর গানের কথায় যে শহর, মানুষ, প্রেম, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব কিংবা অদ্ভুত জীবনের গল্প পাওয়া যায়, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা।

আজ মারজুক রাসেল শুধু একজন কবি বা গীতিকার নন; বাংলা সংস্কৃতি ও বিনোদন অঙ্গনে তিনি একটি স্বতন্ত্র সৃজনশীল নাম। অভাব থেকে উঠে এসে শব্দকে অবলম্বন করে নিজের জায়গা তৈরি করার এই পথচলা প্রমাণ করে—প্রতিভার সঙ্গে যদি থাকে অধ্যবসায়, তাহলে প্রতিকূলতাও একসময় সাফল্যের সিঁড়ি হয়ে উঠতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!