বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অমর নায়ক সালমান শাহ। স্বল্প সময়ের ক্যারিয়ারে অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও পর্দার উপস্থিতি দিয়ে তিনি দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। কিন্তু তার আকস্মিক মৃত্যু তিন দশক পেরিয়েও দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যঘেরা ঘটনা হয়ে আছে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেই দিন থেকেই প্রশ্ন—সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছিল?
মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পরও এ প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এ নিয়ে মামলা, তদন্ত, আদালতের কার্যক্রম এবং নানা সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য ঘটনাটিকে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সম্প্রতি সালমান শাহর মৃত্যু প্রসঙ্গে রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের একাধিক সাক্ষাৎকারের পর নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এসব বক্তব্যে অভিনেত্রী শাবনূরের নাম আসায় এবার প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন এই জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা।
রিজভীর বক্তব্য নিয়ে শাবনূরের প্রশ্ন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে শাবনূর দাবি করেন, রিজভী আহমেদ তাকে সালমান শাহকে ‘ব্ল্যাকমেল’ করার জন্য দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে সালমান ও তার স্ত্রী সামিরার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরিতে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন—এমন অভিযোগও করা হয়েছে বলে জানান শাবনূর।
এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা দাবি করে শাবনূর প্রশ্ন তুলেছেন, রিজভী আহমেদ কীভাবে এবং কোন তথ্যের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করছেন।
শাবনূরের ভাষ্য, “রিজভীর নাম আমি প্রথম শুনেছি সালমান শাহর মৃত্যুর পর, যখন সে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার ঘটনায় রাজসাক্ষী হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন হলো, সে কীভাবে এবং কোন ভিত্তিতে দাবি করছে যে আমি সালমান শাহকে ব্ল্যাকমেল করতাম?”
তিনি আরও বলেন, চলচ্চিত্র অঙ্গনে কারও সঙ্গে কূটনামি বা একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগানোর মতো আচরণ তার স্বভাবের সঙ্গে যায় না। এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
রাজসাক্ষী থেকে নতুন বক্তব্য—বিতর্ক আরও গভীর
শাবনূরের পোস্টে রিজভী আহমেদের অতীতের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। তার দাবি অনুযায়ী, সালমান শাহর মৃত্যুর পর একটি মামলায় রিজভী আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছিলেন।
শাবনূরের দাবি, ওই জবানবন্দিতে রিজভী বলেছিলেন—১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তিনি আরও কয়েকজনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তবে দীর্ঘ ২৯ বছর পর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে রিজভী আহমেদ ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন শাবনূর। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রিজভী সালমান শাহর মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড নয়, আত্মহত্যা হিসেবে বর্ণনা করছেন এবং এর জন্য সালমানের মা নীলা চৌধুরীকেও দায়ী করছেন।
এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন শাবনূর—একই ব্যক্তির পুরোনো ও সাম্প্রতিক বক্তব্যের মধ্যে এত বড় পার্থক্যের কারণ কী?
‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা’
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে শাবনূর স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, সালমান শাহর মৃত্যু কিংবা কথিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল না।
শাবনূর বলেন, “আমি বরাবরের মতোই স্পষ্ট করে বলতে চাই, সালমান শাহর মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র কোনো সংযোগ ছিল না। তিনি কীভাবে মারা গেছেন, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।”
তার দাবি, সালমান শাহ ছিলেন তার অত্যন্ত প্রিয় সহশিল্পী এবং বড় ভাইয়ের মতো একজন মানুষ। ফলে তার মৃত্যুর ঘটনা এখনো তাকে ব্যথিত করে।
নতুন বক্তব্যের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি?
শাবনূর তার পোস্টে আরও দাবি করেন, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে মামলা ও আদালতের কার্যক্রমের কারণে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। এ পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত বা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ নিজেদের রক্ষা করতে রিজভী আহমেদের মাধ্যমে নতুন বক্তব্য দেওয়াতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এমনকি কারও প্ররোচনা কিংবা আর্থিক প্রলোভনেও এসব বক্তব্য দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করেন শাবনূর। তবে এগুলো তার ব্যক্তিগত সন্দেহ ও ধারণা—এগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি
সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি চান শাবনূর। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা বিতর্কের অবসান ঘটাতে হলে কোনো পক্ষের বক্তব্য বা অনুমানের ওপর নির্ভর না করে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
শাবনূর বলেন, “সালমান শাহ শুধু একজন জনপ্রিয় নায়কই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার অত্যন্ত প্রিয় সহশিল্পী এবং বড় ভাইয়ের মতো একজন মানুষ। তার অকাল মৃত্যু আজও আমাকে ব্যথিত করে।”
তার দাবি, তদন্তের মাধ্যমে সালমান শাহ কীভাবে মারা গেছেন, মৃত্যুর পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল এবং কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা উচিত।
তিন দশক পরও যে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি
সালমান শাহর মৃত্যু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। তার মৃত্যুর পর থেকেই আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে। বিভিন্ন সময়ে তদন্ত, মামলা, আদালতের কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে ঘটনাটি নতুন নতুন মাত্রা পেয়েছে।
তবে প্রায় তিন দশক পরও জনমনে থাকা মূল প্রশ্নটির স্থায়ী ও সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য সেই পুরোনো বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
এখন শাবনূরের বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে আরও কয়েকটি প্রশ্ন—রিজভী আহমেদের পুরোনো ও বর্তমান বক্তব্যের পার্থক্যের কারণ কী, সালমান শাহর মৃত্যুর বিষয়ে কোন বক্তব্যটি তথ্য-প্রমাণসম্মত এবং শেষ পর্যন্ত তদন্তে প্রকৃত সত্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?
সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রয়োজন নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। কারণ তিন দশক ধরে ঝুলে থাকা এই রহস্যের নিষ্পত্তিই পারে সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে চলমান জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটাতে।

