আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়ায় লটারি পদ্ধতি বাতিল করে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারের দাবি, এটি হবে ‘নামমাত্র’ একটি পরীক্ষা, যার জন্য আলাদা প্রস্তুতি বা কোচিংয়ের প্রয়োজন হবে না। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ভর্তি পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক নীতিমালা প্রকাশের আগেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে ভর্তি কোচিং বাণিজ্য। ইতোমধ্যে শতাধিক কোচিং সেন্টার শিক্ষার্থী ভর্তি করে নিয়মিত ক্লাসও শুরু করেছে।
শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের ফলে আবারও শিশুদের ওপর বাড়বে মানসিক চাপ, অভিভাবকদের আর্থিক ব্যয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় কোচিংনির্ভর সংস্কৃতি।
রাজধানীজুড়ে ভর্তি কোচিংয়ের প্রচারণা
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর মিরপুর, ধানমন্ডি, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, মতিঝিল, রামপুরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভর্তি কোচিং সেন্টারের ব্যানার, ফেস্টুন ও লিফলেটের ছড়াছড়ি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও স্পন্সর করা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে।
কোথাও চার মাসের বিশেষ কোর্স, কোথাও ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের বিজ্ঞাপনে নামকরা স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তির সফলতার দাবিও করছে।

কোচিং ফি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণির ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করেই সবচেয়ে বেশি ব্যাচ পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানভেদে—
ভর্তি ফি: ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা
মাসিক বেতন: ১ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা
বিশেষ কোর্স: ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত
পাশাপাশি নিয়মিত মডেল টেস্ট, মূল্যায়ন পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র অনুশীলনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
শতাধিক কোচিং সেন্টারে চলছে প্রস্তুতি
রাজধানীতে অন্তত শতাধিক কোচিং সেন্টার ভর্তি প্রস্তুতির নামে ব্যাচ পরিচালনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে জিনিয়াস, কোর ক্যাডেট একাডেমি, উইসডম, জেএএসি, প্রয়াস, মাস্টারউইন, এসএ একাডেমি, ইকরা একাডেমিক অ্যান্ড অ্যাডমিশন কেয়ার, রাজউক কোচিং সেন্টার, লাইসিয়াম, ব্রেইন ব্রাইড একাডেমিসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
এছাড়া অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন শিক্ষা প্ল্যাটফর্মও ভর্তি প্রস্তুতির কোর্স চালু করেছে।
চার-পাঁচ বছরের শিশুরাও কোচিংয়ে
মালিবাগ, সিদ্ধেশ্বরী, মতিঝিল ও মিরপুরের একাধিক কোচিং সেন্টারে দেখা গেছে, চার থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরাও প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করছে, আর বাইরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন তাদের অভিভাবকরা।
কোচিং উদ্যোক্তারা জানান, ২০২১ সালে লটারি পদ্ধতি চালুর পর ভর্তি কোচিং কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের পর অভিভাবকদের আগ্রহ হঠাৎ বেড়ে গেছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা—তিন শিফটে ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে।
অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ
অনেক অভিভাবক ব্যক্তিগতভাবে ভর্তি কোচিংয়ের বিরোধিতা করলেও প্রতিযোগিতার ভয়ে সন্তানদের কোচিংয়ে ভর্তি করাতে বাধ্য হচ্ছেন।
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, "ছোট বাচ্চাকে কোচিং করাতে চাইনি। কিন্তু অন্যরা যখন করছে, তখন আমার সন্তান পিছিয়ে পড়বে—এই ভয় থেকেই ভর্তি করিয়েছি।"
অভিভাবক শারমিন আক্তার বলেন, "আমি কখনোই ছোট শিশুদের কোচিং করানোর পক্ষে ছিলাম না। কিন্তু সবাই যখন ভর্তি কোচিং করছে, তখন বাধ্য হয়েছি।"
মিরপুরের নাঈমা মিতু বলেন, "আমি নিজেই সন্তানকে পড়াই। তারপরও পরীক্ষার ধরন বুঝতে কোচিংয়ে ভর্তি করিয়েছি। এতে সংসারের অন্যান্য খরচ কমাতে হচ্ছে।"
সরকারের আশ্বাস
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তিনি বলেন, "এটি হবে একটি নামমাত্র পরীক্ষা। ক্যাচমেন্ট এরিয়া এবং সহজ মূল্যায়ন পদ্ধতির সমন্বয়ে ভর্তি করা হবে। এমন ব্যবস্থা করা হবে, যাতে কোনো অভিভাবককে সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠাতে না হয়।"
অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখার বিষয়টি মাধ্যমিক কর্তৃপক্ষ দেখবে।
শিক্ষাবিদদের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মনে করেন, প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা শিশুদের জন্য অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ তৈরি করে।
তিনি বলেন, "দীর্ঘমেয়াদে ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থাই সবচেয়ে কার্যকর ও শিশুবান্ধব সমাধান। ছোট শিশুদের শিক্ষাজীবনের শুরু হওয়া উচিত আনন্দময় পরিবেশে, প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয়।"
ভর্তি নীতিমালা এখনও চূড়ান্ত নয়
যদিও সরকার ভর্তি পরীক্ষা চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে পরীক্ষার ধরন, মানবণ্টন, প্রশ্নপদ্ধতি এবং সময়সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

অনিয়মের আশঙ্কা
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ভর্তি পরীক্ষা চালুর ঘোষণা আগেভাগে দেওয়ায় কোচিং সেন্টারগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পেয়েছে।
তার ভাষায়, অতীতে ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নফাঁস, নম্বর কারসাজি ও ঘুষের অভিযোগ ছিল। তাই এবারও কার্যকর নজরদারি না থাকলে কোচিং বাণিজ্যের পাশাপাশি অনিয়মের ঝুঁকিও বাড়বে।
শিক্ষাবিদদের মতে, সরকার যদি দ্রুত ভর্তি পরীক্ষার স্পষ্ট নীতিমালা প্রকাশ না করে, তাহলে অভিভাবকদের অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে এবং সেই সুযোগে কোচিংনির্ভর বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কোমলমতি শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার।

