ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

ঝিনাইদহে ১১ মাসে ৬ ‘মব’ ও গণপিটুনি, নিহত ৩—আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতায় বাড়ছে আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ১০:৫২ এএম

ঝিনাইদহে ১১ মাসে ৬ ‘মব’ ও গণপিটুনি, নিহত ৩—আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতায় বাড়ছে আতঙ্ক

ছবিঃ সংগৃহীত

ঝিনাইদহে গত ১১ মাসে পৃথক ছয়টি ‘মব’ বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত তিনজন নিহত এবং শিক্ষকসহ অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। চুরি, ধর্ষণচেষ্টা, যৌন হয়রানি ও পরকীয়ার মতো অভিযোগকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই বা আইনগত প্রক্রিয়ার আগেই হামলা চালানো হয়েছে। ফলে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অপরাধের অভিযোগ উঠলেই তদন্ত, গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে একদল মানুষের হাতে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ঝিনাইদহে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ২১ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় অন্তত ছয়টি ‘মব’ বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ছয়জন।

স্থানীয় বাসিন্দা, মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলেই তাকে মারধর বা গণপিটুনি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। এতে শুধু একজনের জীবনই ঝুঁকিতে পড়ে না, বরং আইনের শাসন, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় ঝিনাইদহ সদর থানায় তিনটি এবং কালীগঞ্জ থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। তবে অধিকাংশ মামলায় এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। পৃথক ঘটনায় এখন পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

১১ মাসে ছয় ‘মব’, তিন মৃত্যু

গত ১১ মাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর কয়েকটিতে অভিযোগের ভিত্তিতে মানুষকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়েছে। পরে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে কিংবা ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতালে চুরির অপবাদে প্রাণ গেল সুজনের

২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে চুরির অপবাদে সুজন মিয়া (২৮) নামে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

সুজন মিয়া মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানার বাগড়া গ্রামের কাশেম মালের ছেলে। বৈবাহিক সূত্রে তিনি ঝিনাইদহে বসবাস করতেন।

এ ঘটনায় সুজনের বাবা বাদী হয়ে ঝিনাইদহ সদর থানায় অজ্ঞাত চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

শিশুকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে রিকশাচালকের মৃত্যু

চলতি বছরের ৪ জুন দুপুরে সদর উপজেলার ক্যাডেট কলেজের সামনে ঝিনুকমালা আবাসন প্রকল্পে সাত বছরের এক শিশুকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করার অভিযোগে বিল্লাল হোসেন (৪০) নামে এক রিকশাচালককে গণপিটুনি দেওয়া হয়।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে পরে তার মৃত্যু হয়। বিল্লাল মাগুরার মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্বজন ও ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব মামলায় কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি বলে জানা গেছে।

গরু চুরির অভিযোগে গাছে ঝুলিয়ে মারধর

সবশেষ ২২ আগস্ট ভোরে কালীগঞ্জ উপজেলার বাদুড়গাছা গ্রামে গরু চুরির অভিযোগ তুলে যশোর ও নাটোর জেলার দুই ব্যক্তিকে ধরে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুজনকে গাছে ঝুলিয়ে মারধর করা হয়। এতে আয়নাল নামে একজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। আহত হন সুমন হোসেন।

নিহত আয়নালের বাড়ি নাটোরের বনকুড়ি গ্রামে। আহত সুমন যশোর সদর উপজেলার আরাপপুর এলাকার বাসিন্দা।

ঘটনার পর বাদুড়গাছা গ্রামের নিলুফা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জ থানায় মামলা করেন। অন্যদিকে গণপিটুনিতে আহত সুমনের বড় ভাই জাহাঙ্গীর হোসেনও পৃথক মামলা করেন। তিনি অজ্ঞাত ২০০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করেছেন।

তবে এসব মামলায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

মোবাইল চুরির অপবাদে শিশুকে গণপিটুনি

গত ১১ জুলাই সদর উপজেলার ডাকবাংলা বাজারে মোবাইল চুরির অপবাদে ১৪ বছর বয়সী এক শিশুকে রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে গণপিটুনি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

ঘটনাটি সামাজিকভাবে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পরকীয়ার অভিযোগে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে মারধর

এর কয়েক দিন আগে সদর উপজেলার লৌহজং এলাকায় পরকীয়ার অভিযোগ তুলে এক বৃদ্ধ ও এক বৃদ্ধাকে রশি দিয়ে বেঁধে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

এ ক্ষেত্রেও থানায় কোনো মামলা বা লিখিত অভিযোগ হয়নি বলে জানা গেছে।

স্কুলে ঢুকে শিক্ষককে গণপিটুনি

গত ১৮ আগস্ট সকালে কালীগঞ্জ উপজেলার বড়-বায়শা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে স্কুলের অফিস কক্ষে ঢুকে গণপিটুনি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে স্থানীয় কয়েকজন ওই শিক্ষককে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।

পরে ওই শিক্ষার্থীর মা শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং ওই রাতেই পুলিশ শাহ আলমকে গ্রেপ্তার দেখায়।

তবে শিক্ষকের পরিবারের দাবি, স্কুলের পুকুর ইজারার টাকা নিয়ে স্থানীয় একটি পক্ষের সঙ্গে বিরোধের জেরে তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও তারা দাবি করেন।

ঘটনার পর সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঢুকে একজন শিক্ষককে গণপিটুনি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষককে গণপিটুনির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি।

মামলা হলেও গ্রেপ্তার কম, বাড়ছে ‘মব’ আতঙ্ক

জেলায় গত ১১ মাসে ছয়টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটলেও এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের বড় অংশ এখনো আইনের আওতায় আসেনি। ফলে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আরও উৎসাহিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন নাগরিকরা।

তাদের মতে, একটি অভিযোগ সত্য কি না তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গুজব কিংবা তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ধরে নিয়ে মারধর করা হলে নিরপরাধ মানুষও এর শিকার হতে পারেন।

বিশেষ করে চুরি, ধর্ষণচেষ্টা বা যৌন হয়রানির মতো স্পর্শকাতর অভিযোগে জনতার উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘গণপিটুনি কোনো সমাধান নয়’

কালীগঞ্জের বাদুড়গাছা গ্রামে গণপিটুনিতে আহত সুমনের বড় ভাই ও মামলার বাদী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, তার ভাই দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে অসুস্থ। তিনি দাবি করেন, কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে এভাবে মারধর করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তার ভাষ্য, অপরাধের অভিযোগ থাকলে পুলিশে দেওয়া এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার করাই সঠিক পথ। গণপিটুনির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

জেলা মানবাধিকারকর্মী শরিফা খাতুন বলেন, গণপিটুনি কোনো সমাধান নয়। অপরাধ করলে তার জন্য আইন ও আদালত রয়েছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো ঘটনায় মব তৈরি হওয়ার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

‘মব’ রোধে পুলিশের স্বপ্রণোদিত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে

ঝিনাইদহ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কাজী একরামুল হক আলম বলেন, গণপিটুনি বা ‘মব’ করে কাউকে মারধর করা আইনসম্মত নয়।

তার মতে, কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইন ও আদালত রয়েছে। গণপিটুনির ঘটনায় ভুক্তভোগী ও তার পরিবার আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, কোনো ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে বাদী পাওয়া না গেলেও পুলিশ পরিস্থিতি ও ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় স্বপ্রণোদিত হয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। গণপিটুনির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পুলিশের বক্তব্য: যাচাই করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে

ঝিনাইদহ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজ হোসেন বলেন, যেসব মামলা পুলিশের হাতে রয়েছে, সেগুলো ঘটনার মেরিট অনুযায়ী তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গণপিটুনির ঘটনায় অনেক মানুষ জড়িত থাকার কারণে যাচাই-বাছাই ছাড়া সবাইকে গ্রেপ্তার করা ঠিক হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এ কারণে কোনো কোনো মামলায় সময় লাগছে।

আইন হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান প্রশাসনের

ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়, সে বিষয়ে প্রশাসন কাজ করছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার বিচার আইন অনুযায়ী হবে; জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই।

আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় সতর্কবার্তা

ঝিনাইদহে গত ১১ মাসের ছয়টি গণপিটুনির ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতা নয়; এগুলো সমাজে বিচারব্যবস্থার বাইরে গিয়ে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার প্রবণতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। অভিযোগ সত্য কি না, অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ কি না কিংবা প্রকৃত অপরাধী কে—এসব নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘মব’ ঠেকাতে হলে দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধ, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা এবং গণপিটুনিতে জড়িতদের দৃশ্যমান আইনি শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

অন্যথায় আজ যে ব্যক্তি চুরির অপবাদে গণপিটুনির শিকার হচ্ছেন, কাল একই ধরনের অভিযোগে নিরপরাধ আরেকজনও জনতার সহিংসতার শিকার হতে পারেন। তাই অপরাধ দমনের পাশাপাশি আইনের শাসন ও জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করাই এখন ঝিনাইদহের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!