সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ (অব.) ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে সাভার ও আশপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি দখল, জাল দলিলের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তন এবং অবৈধ অর্থে জমি কেনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভাকুর্তা, আমিনবাজার, শ্যামলাসী, বড়বরদেশী ও শ্যামলাপুর মৌজায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বিঘা জমি দখল বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জেনারেল আজিজ আহমেদ বা তাঁর অভিযুক্ত সহযোগীদের বক্তব্য এ প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে সংশ্লিষ্ট নথি, ভূমি রেকর্ড, দলিল এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উত্থাপিত অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২১ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালনকালে সরাসরি নিজের নামে জমি না কিনে তাঁর ভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফ, আরেক ভাই আনিস আহমেদের ছেলে আসিফ আহমেদ, সহযোগী হিসেবে পরিচিত হাবিব, বোনের স্বামী নূরুল ইসলাম এবং ম্যানেজার মনিরের মাধ্যমে বিভিন্ন সম্পত্তি কেনা ও নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাভারের ভাকুর্তা ইউনিয়নের নলাগড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন ওরফে ‘চায়না আনোয়ারের’ মাধ্যমেও জমি কেনাবেচা এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
ভাকুর্তায় একাধিক এলাকায় জমি দখলের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ভাকুর্তা ইউনিয়নের লুটেরচর, দুদু মার্কেট, শ্যামলাসী বাহেরচর ও শ্যামলাসী কলাতিয়াপাড়া এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির জমি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
স্থানীয় কয়েকজন ভুক্তভোগীর দাবি, জমির প্রকৃত মালিকদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হলে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে হাবিব ও মনির নামের দুই ব্যক্তি ওই এলাকায় অবস্থান করে জমির মালিকদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সিলিকন সিটিতে জলাধার ভরাটের অভিযোগ
অভিযোগের একটি অংশ আমিনবাজার ইউনিয়নের বড়বরদেশী মৌজাকে ঘিরে। সেখানে ‘সিলিকন সিটি’ নামে একটি আবাসন প্রকল্পে প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে সরকারি নথিতে চিহ্নিত জমি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আরএস ১৩০৩ দাগ ও ৩৩৯ নম্বর খতিয়ানের প্রায় এক একর জমি ছাড়াও বড়বরদেশী মৌজার ১৩১১ দাগে ৩০ দশমিক ৬ কাঠা এবং ১৭৬১ দাগে প্রায় ৮০ কাঠা জমি নিয়ে মালিকানা ও দখল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব জমির কিছু অংশ সরকারি রেকর্ডে ‘ছুট’ বা প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত।
সিলিকন সিটিতে জেনারেল আজিজ আহমেদের একটি বাংলোবাড়ি ও রিসোর্ট রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পটির পরিচালক হিসেবে ফয়েজ আহমেদ, কায়সার ও মেহেদী হাসানের নাম উঠে এসেছে। তাদের অনুপস্থিতির কারণে বর্তমানে প্রকল্পটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
শ্যামলাসীতে জলাধার ও জমি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
শ্যামলাসী কলাতিয়াপাড়ায় জমজম হাউজিংয়ের পাশে থাকা প্রায় ৮০ শতক ও ৫০ শতকের দুটি জলাধার সাবেক সেনাপ্রধানের ভাই জোসেফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দুদু মার্কেটসংলগ্ন অ্যাকটিভ প্রিক্যাডেট স্কুলের পাশে আরএস ১৩৪৯ দাগের প্রায় ১৮ শতক জমি ২০২২ সালে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ইউনূসের নামে কেনা হলেও অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৃতপক্ষে এটি জেনারেল আজিজের ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে কেনা হয়েছিল।
জমিটির ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা—এসব বিষয় ভূমি রেজিস্ট্রি ও আর্থিক লেনদেনের নথি যাচাই করে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শ্যামলাপুরে ৫২ শতক জমি নিয়ে ব্যাংক মর্টগেজের অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি শ্যামলাপুর মৌজার ৫২ শতক জমিকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসএ ৩৫৮ ও ৩৫৯ এবং আরএস ২৫০০ ও ২৫০১ দাগের আওতাধীন জমির মধ্যে খোরশেদ আলমের ২৬ শতক, সেজান জুস কোম্পানির ২১ দশমিক ০৫ শতক এবং একরামুল হক হানিফের ৪ দশমিক ৯৫ শতক—মোট ৫২ শতক জমি ভুয়া দলিলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওই দলিলের ভিত্তিতে জমিটি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখায় মর্টগেজ রাখা হয়েছে।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ব্যাংকের মর্টগেজ ফাইল, দলিলের বৈধতা, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, ঋণগ্রহীতা, জামানতদাতা এবং সংশ্লিষ্ট অর্থের উৎস পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে জমির প্রকৃত মালিকানা ও ব্যাংকে দাখিল করা দলিল ভূমি অফিসের মূল রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রকৃত মালিক জমি উদ্ধারে গেলে হুমকির অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রকৃত মালিকদের একজন জমি উদ্ধারের উদ্যোগ নিলে জেনারেল আজিজের ম্যানেজার হিসেবে পরিচিত মনির তাকে হুমকি দেন।
বর্তমানে ওই জমি সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা রয়েছে এবং সেখানে ‘মাইশা কুটির, সাবিকুল ইসলাম দুর্জয়’ লেখা একটি ফলক রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া শ্যামলাপুর স্কুলের পাশে আরএস ২৮৮৬ দাগের প্রায় পাঁচ কাঠার একটি প্লট নূরুল ইসলাম ও হাবিবের যৌথ নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সেটি সম্প্রতি বিক্রি করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
দলিল, বায়নানামা ও ভূমি রেকর্ডে অসঙ্গতির অভিযোগ
স্থানীয় রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি রেকর্ডের তথ্য পর্যালোচনার দাবি করে অভিযোগকারীরা বলছেন, শ্যামলাপুর ও বড়বরদেশী মৌজার বিভিন্ন দাগে মালিকানা নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি নথিতে ‘ছুট’ বা জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জমির ওপর দখলের অভিযোগও রয়েছে।
হাতে লেখা বায়নানামা ও বিভিন্ন চুক্তিপত্রেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জমি কেনার নামে স্বত্ব ত্যাগের ধরনের চুক্তি করা হলেও পরবর্তী সময়ে নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্ট্রি সম্পন্ন না করে জমি দখলে রাখা হয়েছে।
এ ধরনের লেনদেনে আমমোক্তারনামা, হস্তান্তরের ক্ষমতা এবং নিবন্ধন-সংক্রান্ত আইনি বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে পরিষ্কার হতে পারে।
চায়না আনোয়ারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
সাভারের নলাগড়িয়া এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন ওরফে ‘চায়না আনোয়ারের’ মাধ্যমে জমি কেনা এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, জমি ক্রয় ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তিনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে আরও দাবি করা হয়েছে, জেনারেল আজিজ আহমেদ ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। গত ২২ আগস্ট রাতে চায়না আনোয়ার চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে চীন যান এবং পরদিন ভারতে অবস্থানরত জোসেফের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওনা হন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
এসব ভ্রমণ ও যোগাযোগের তথ্যের স্বাধীন যাচাই ছাড়া এর সঙ্গে জমি লেনদেনের সম্পর্ক নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
তদন্তের আওতায় আসতে পারে যেসব বিষয়
অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে—
অভিযুক্ত জমিগুলোর মূল দলিল ও খতিয়ান যাচাই;
সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস রেকর্ডের সঙ্গে বর্তমান মালিকানা মিলিয়ে দেখা;
জমির ক্রয়মূল্য ও অর্থের উৎস অনুসন্ধান;
প্রকৃত সুবিধাভোগী বা বেনামি মালিকানা শনাক্ত করা;
জাল দলিল তৈরি বা ব্যবহার করা হয়েছে কি না তা পরীক্ষা;
প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জমিতে স্থাপনা নির্মাণের বৈধতা যাচাই;
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের মর্টগেজ ও ঋণসংক্রান্ত নথি পুনঃপরীক্ষা;
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক লেনদেন ও সম্পদ বিবরণী যাচাই;
জমি দখল ও হুমকির অভিযোগে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য গ্রহণ।
বিশেষ করে ৫২ শতক জমির মর্টগেজের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জমির মালিকানা বা দলিল জালিয়াতির অভিযোগ সত্য হলে কীভাবে সেই দলিল ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য নথি হিসেবে ব্যবহৃত হলো, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।
জলাধার রক্ষায় আইন প্রয়োগের দাবি
অভিযোগে যেসব জমিকে প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত শ্রেণি ভূমি রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি ও সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জলাধার ভরাট বা শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগ সত্য হলে পরিবেশ ও ভূমি-সংক্রান্ত প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের মতে, ব্যক্তির পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে জমির মালিকানা, দলিলের বৈধতা, অর্থের উৎস এবং দখলের বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে প্রকৃত মালিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অবৈধ দখল প্রমাণিত হলে তা উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সাভার ও আশপাশের এলাকায় জমি দখল, দলিল জালিয়াতি, বেনামি সম্পদ এবং অবৈধ অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের প্রভাব ব্যবহার করে ভূমি নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য চিত্র নিয়ে। অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হবে সংশ্লিষ্ট নথি, দলিল, ব্যাংক রেকর্ড, ভূমি জরিপ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে।
তাই সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদসহ যাদের নাম অভিযোগে এসেছে, তাদের সম্পৃক্ততা থাকলে তা যেমন আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্টদের দায়ও নির্ধারণ করা জরুরি। একটি নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তই পারে দীর্ঘদিনের এসব অভিযোগের প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে।

