বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্যের মান যাচাইয়ে নিয়মিত নজরদারি জোরদার করেছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। এরই ধারাবাহিকতায় ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় বাংলাদেশ মান (বিডিএস) অনুযায়ী নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বম্বে সুইটসের পাঁচ ধরনের মসলাসহ মোট ১০টি নিম্নমানের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে এসব পণ্যের অনুকূলে বিএসটিআইয়ের দেওয়া লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না—তা জানতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
পরীক্ষায় নিম্নমানের প্রমাণিত এসব পণ্য না কেনার জন্য ভোক্তাদের সতর্ক করেছে বিএসটিআই।
নিয়মিত সার্ভিল্যান্সে ধরা পড়ল নিম্নমানের পণ্য
বিএসটিআই জানিয়েছে, নিয়মিত সার্ভিল্যান্স কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন বাজার থেকে বিভিন্ন কোম্পানির খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে সেসব নমুনা বিএসটিআইয়ের নিজস্ব অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষায় বেশ কিছু পণ্য নির্ধারিত মান অনুযায়ী উত্তীর্ণ হলেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঘি, বাটার অয়েল ও মসলায় নির্ধারিত মানের ব্যত্যয় পাওয়া যায়।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স বাতিলের বিষয়ে কারণ দর্শানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
বম্বে সুইটসের পাঁচ মসলা নিম্নমানের
বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় বম্বে সুইটস অ্যান্ড কোং লিমিটেডের উৎপাদিত পাঁচ ধরনের মসলা বাংলাদেশ মান অনুযায়ী অকৃতকার্য হয়েছে।
নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত পণ্যগুলো হলো—
কারী পাউডার হাঁসের মাংসের মসলা — ব্যাচ নং ১৪১২২৪
তেহারি মসলা — ব্যাচ নং ১৪০২২৬
কালা ভুনা মসলা — ব্যাচ নং ২৬০৯২৭
গরুর মাংসের মসলা — ব্যাচ ‘এ’
মাছের মসলা — ব্যাচ ‘এ’
বিএসটিআইয়ের ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় এসব মসলায় মোট অ্যাশ ও লবণের মাত্রা নির্ধারিত সীমার তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে। ফলে বাংলাদেশ মান (বিডিএস) অনুযায়ী পণ্যগুলো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে।
‘ঘি’তে দুধের চর্বি নেই, পাম অলিন ও বনস্পতি ব্যবহারের অভিযোগ
নিম্নমানের পণ্যের তালিকায় কয়েকটি ঘি ও বাটার অয়েলও রয়েছে।
বিএসটিআইয়ের পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, বাঘাবাড়ি ব্র্যান্ডের ঘিতে নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যের ‘ঘি’ বা মিল্ক ফ্যাট পাওয়া যায়নি। পরীক্ষায় পাম অলিন ও বনস্পতি ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে বলে বিএসটিআই জানিয়েছে।
অর্থাৎ, যে পণ্যকে ঘি হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে, সেটির উপাদান ও গুণগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে পরীক্ষায় ধরা পড়েছে।
যে পাঁচ ঘি ও বাটার অয়েল পরীক্ষায় অকৃতকার্য
বাংলাদেশ মানের বিভিন্ন প্যারামিটারে অকৃতকার্য হওয়া পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. বাঘাবাড়ি প্রিমিয়াম ঘি কোম্পানি
ব্র্যান্ড: বাঘাবাড়ি ঘি
উৎপাদনের তারিখ: ১ জুলাই ২০২৬
মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ: ৩০ জুলাই ২০২৮
২. কিশোরগঞ্জ ফুড প্রোডাক্টস
ব্র্যান্ড: অরুন বাঘাবাড়ী ঘি
উৎপাদনের তারিখ: ১৭ জুলাই ২০২৬
মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৭
৩. মেসার্স মামুন ফুড প্রোডাক্ট
ব্র্যান্ড: নিউ রাঁধুনী ঘি
উৎপাদনের তারিখ: ১৫ এপ্রিল ২০২৫
মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ: ১৪ এপ্রিল ২০২৭
৪. মেসার্স মামুন ফুড প্রোডাক্ট
ব্র্যান্ড: সিটি ঘি
উৎপাদনের তারিখ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬
মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৮
৫. এলডার্স ফুড প্রোডাক্টস অ্যান্ড প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ
ব্র্যান্ড: এলডার্স বাটার অয়েল
ব্যাচ নং: ০২২০২৬
যে পরীক্ষাগুলোতে মানের ব্যত্যয়
বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট ঘি ও বাটার অয়েলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক ও ভৌত বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত সীমার মধ্যে পাওয়া যায়নি।
বিশেষ করে—
রিফ্র্যাক্টিভ ইনডেক্স
আয়োডিন ভ্যালু
স্যাপোনিফিকেশন ভ্যালু
পলেন্সকে ভ্যালু
এসব প্যারামিটারে নির্ধারিত মানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বিএসটিআই।
খাদ্যপণ্যের মান যাচাইয়ে এসব প্যারামিটার গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নির্ধারিত সীমার বাইরে ফলাফল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পণ্যকে মানসম্মত হিসেবে বাজারজাত করার ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি হয়।
বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ
ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নির্ধারিত মান পূরণে ব্যর্থ হওয়া পণ্যগুলো বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে বিএসটিআই।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এজন্য তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
তবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া মানেই লাইসেন্স চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়ে গেছে—এমন নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাখ্যা ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
ভোক্তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ
নিম্নমানের এসব পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকার জন্য ভোক্তাদের পরামর্শ দিয়েছে বিএসটিআই।
পণ্য কেনার আগে বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন ও লাইসেন্স নম্বর যাচাই করার পাশাপাশি উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, পণ্যের উপাদান এবং প্যাকেটের অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য ভালোভাবে দেখে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিশেষ করে ঘি, বাটার অয়েল, মসলা ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য কেনার সময় শুধু পরিচিত ব্র্যান্ডের নামের ওপর নির্ভর না করে প্যাকেটের লেবেল ও মানসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
‘মান বজায় রাখা আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব’
বিএসটিআই মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বলেন, জাতীয় মান অনুযায়ী পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা প্রতিটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব।
কোনো প্রতিষ্ঠান এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বিএসটিআই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, শুধু পণ্যের মান সনদ প্রদান নয়, নকল ও ভেজাল পণ্য প্রতিরোধে সার্ভিল্যান্স কার্যক্রমের মাধ্যমে বিএসটিআই নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ জানাতে বিএসটিআইয়ের হটলাইন
বিএসটিআই মহাপরিচালক ভোক্তাদের উদ্দেশে বলেন, কোনো পণ্যের মান নিয়ে সন্দেহ, ভেজাল, প্রতারণা অথবা বিএসটিআইয়ের মানচিহ্নের অপব্যবহার নজরে এলে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
অভিযোগ বা তথ্য জানাতে বিএসটিআইয়ের হটলাইন ১৬১১৯-এ কল করা যাবে। পাশাপাশি dg@bsti.gov.bd ঠিকানায় ই-মেইলের মাধ্যমেও অভিযোগ জানানো যাবে।
বাজারে খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআইয়ের এমন সার্ভিল্যান্স কার্যক্রম ভোক্তা অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিম্নমানের পণ্য শনাক্তের পর বাজার থেকে সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে প্রত্যাহার করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—সেটিও নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এক নজরে ১০ নিম্নমানের পণ্য
বম্বে সুইটসের ৫ মসলা:
১. কারী পাউডার হাঁসের মাংসের মসলা
২. তেহারি মসলা
৩. কালা ভুনা মসলা
৪. গরুর মাংসের মসলা
৫. মাছের মসলা
ঘি ও বাটার অয়েলের ৫ পণ্য:
৬. বাঘাবাড়ি ঘি
৭. অরুন বাঘাবাড়ী ঘি
৮. নিউ রাঁধুনী ঘি
৯. সিটি ঘি
১০. এলডার্স বাটার অয়েল

