ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

অনলাইন মার্কেটিংয়ের ফাঁদে ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ: ডিবির জালে দুইজন, তদন্তে মিলছে আরও কয়েকজনের নাম

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: আগস্ট ২৬, ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

অনলাইন মার্কেটিংয়ের ফাঁদে ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ: ডিবির জালে দুইজন, তদন্তে মিলছে আরও কয়েকজনের নাম

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীতে অনলাইন মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে সহজে ও দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে চাকরিজীবী এক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ১৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি প্রতারক চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মোহাম্মদ হাসান ও রিফাতুর রহমান। ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীরের অভিযোগ, টেলিগ্রামভিত্তিক একটি অনলাইন মার্কেটিং প্ল্যাটফর্মে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ধাপে ধাপে তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। পরে বিপুল অঙ্কের টাকা জমা দেওয়ার পরও অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ না দিয়ে তাকে আরও টাকা জমা দিতে বলা হয়।

এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলা করেন ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর। আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে ন্যস্ত হয়। এরপর প্রায় নয় মাস ধরে মামলাটির বিভিন্ন দিক তদন্ত করে ডিবি। তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য, ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা করা হয় বলে জানা গেছে। পরে প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মোহাম্মদ হাসান ও রিফাতুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

টেলিগ্রামে চাকরির প্রলোভন

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই দুপুরে নিজ বাসায় অবস্থানকালে জাহাঙ্গীরের ব্যবহৃত টেলিগ্রামে ‘তানিয়া আহমেদ’ নামের একটি আইডি থেকে অনলাইনে বাসায় বসে আয় করার প্রস্তাব আসে। বিস্তারিত জানতে চাইলে তাকে জানানো হয়, একজন এজেন্ট তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজের বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন।

এর কিছুক্ষণ পর ‘ফারিয়া জান্নাত’ নামের একটি টেলিগ্রাম আইডি থেকে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাকে একটি ওয়েবসাইটের লিংক পাঠিয়ে মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলার কথা বলা হয়। কথিত কোম্পানি হিসেবে ‘Merlin’ নাম ব্যবহার করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন বাদী।

অ্যাকাউন্ট খোলার পর সেখানে ১০ হাজার টাকা ‘ট্রায়াল বোনাস’ হিসেবে দেখানো হয়। ওই টাকা ব্যবহার করে বিভিন্ন ধাপে ৭৫টি টাস্ক সম্পন্ন করার পর প্রথম দিনেই ৫ হাজার ৯১৯ টাকা লাভ হয়েছে বলে অ্যাকাউন্টে দেখানো হয়।

ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে বিনিয়োগ

পরদিন ফারিয়া জান্নাত জাহাঙ্গীরকে ‘Merlin Discussion UD Group 4048’ নামের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করেন। গ্রুপটিতে কয়েকজন অ্যাডমিনসহ ৫০ জনের বেশি সদস্য ছিল বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ২২ জুলাই ফারিয়ার নির্দেশনায় একটি সিটি ব্যাংক হিসাবে ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে কাজ শুরু করেন জাহাঙ্গীর। প্রথম সেটের কাজ শেষ করার পর তার অ্যাকাউন্টে ১ লাখ ৫৬ হাজার ২৪২ টাকা ব্যালেন্স দেখানো হয়।

এরপর দ্বিতীয় সেটের কাজ শুরু করলে একটি ‘স্ক্র্যাচ কার্ডে’ বোনাস পাওয়ার কথা দেখানো হয়। এতে অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫৩৮ টাকা। এরপর বোনাস পাওয়ার জন্য আরও ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা জমা দিতে বলা হয়। জাহাঙ্গীর ওই টাকা জমা দেন।

তৃতীয় ধাপে কাজ শেষ করার আগে তার অ্যাকাউন্টে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ৮৩০ টাকা ব্যালেন্স দেখানো হয়। একই সঙ্গে ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা ‘মাইনাস ব্যালেন্স’ দেখিয়ে ওই অর্থ জমা দিতে বলা হয়। সেটিও জমা দেন তিনি।

এরপর কাজ শেষ করার পর অ্যাকাউন্টে ২১ লাখ ৭৫ হাজার ৮৫০ টাকা দেখানো হলেও আবার ৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ‘মাইনাস ব্যালেন্স’ দেখানো হয়। পুরো অর্থ উত্তোলনের জন্য ওই টাকাও জমা দিতে বলা হলে জাহাঙ্গীর সেটিও জমা দেন।

টাকা তুলতে গেলেই নতুন শর্ত

এজাহারে জাহাঙ্গীর অভিযোগ করেন, সব কাজ শেষ করে অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করলে তার অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়। যোগাযোগ করা হলে তাকে জানানো হয়, একসঙ্গে এত টাকা ক্যাশ আউট করা তাদের ‘পলিসিতে’ নেই।

পরে টাকা উত্তোলনের জন্য আরও ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ‘সিকিউরিটি মানি’ জমা দিতে বলা হয়। তখন সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জাহাঙ্গীর বুঝতে পারেন, তিনি বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

এরপর তিনি আর ওই টাকা জমা না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে থাকেন। মামলার বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগেই বিভিন্ন ধাপে তার কাছ থেকে প্রায় ১৪ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল।

ব্যাংক হিসাব ঘিরে লেনদেনের জাল

মামলার এজাহারে জাহাঙ্গীর কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের তথ্য উল্লেখ করেছেন। তার অভিযোগ, তার কাছ থেকে নেওয়া টাকা একটি হিসাব থেকে আরেকটি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। এভাবে একাধিক হিসাবের মাধ্যমে অর্থের লেনদেন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি হিসাব হলো—

MD. KHAIRUL ALAM BABLU — City Bank PLC, A/C No: 2304513629001
MST. MAHFUZA KHATUN — City Bank PLC, A/C No: 2224342345001
R R INTERNATIONAL — City Bank PLC, A/C No: 1503643393001
MD. HASAN — City Bank PLC, A/C No: 2304023301001
MAHMUDUL HASAN — City Bank PLC, A/C No: 2302517866001
MOHAMMED HASAN — City Bank PLC, A/C No: 2803345036001

বাদীর অভিযোগ, এসব হিসাবের মধ্যে একজনের কাছ থেকে আরেকজনের হিসাবে টাকা স্থানান্তরের মাধ্যমে লেয়ারিংয়ের মতো পদ্ধতিতে অর্থ সরানো হয়েছে। তবে এসব লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অর্থের চূড়ান্ত গন্তব্য তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

দুই আসামির পারিবারিক যোগসূত্র

তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া মোহাম্মদ হাসান এবং মামলার ৫ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা মাহমুদুল হাসান আপন ভাই বলে জানা গেছে। দুজনের পিতা আব্দুল মোনাফ এবং মাতা মুসলিমা—এমন তথ্য মামলার নথিতে রয়েছে বলে জানা গেছে।

তাদের বর্তমান ঠিকানা হিসেবে রাজধানীর ভাটারা থানার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঠিকানা থেকেই মোহাম্মদ হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রিফাতুর রহমানকে ঘিরে আরও প্রশ্ন

মামলার আরেক গ্রেপ্তার আসামি রিফাতুর রহমান। তার পিতা মোহাম্মদ রফিকুর রহমান এবং মাতা রাশিদা রহমান বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

রিফাতুর রহমানের ব্যাংক হিসাবে ব্যবহৃত একটি মোবাইল নম্বর তার স্ত্রী হালিমা আক্তার লাবনী ব্যবহার করেন বলে অভিযোগে উঠে এসেছে। লাবনী ‘এল এ ইভেন্টস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজেও একই মোবাইল নম্বর ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে ওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে হালিমা আক্তার লাবনী রিফাতুর রহমানের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, কোনো বিষয়ে প্রতারণা হয়ে থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি দেখবে—এখানে সাংবাদিকদের কাজ কী।

পরে রায়হান চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি প্রতিবেদককে ফোন করে পরিচয় জানতে চান এবং এ বিষয়ে কথা বলেন। একপর্যায়ে তিনি হালিমা আক্তার লাবনীকে রিফাতুর রহমানের স্ত্রী হিসেবে স্বীকার করেন বলে প্রতিবেদকের দাবি।

গ্রেপ্তারের পর বাদীকে ‘ম্যানেজের’ চেষ্টা?

মামলার বাদী জাহাঙ্গীরের দাবি, রিফাতুর রহমান গ্রেপ্তারের পরদিন মগবাজার চৌরাস্তার একটি রেস্টুরেন্টে রায়হান চৌধুরী ও আরও একজন ব্যক্তি তার সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে তাকে নগদ ৩ লাখ টাকা দিয়ে মামলা মীমাংসা বা ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে এ ঘটনার উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং তারা কার পক্ষে সেখানে গিয়েছিলেন—এসব বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

বাদীর দাবি, আসামির পক্ষে এ ধরনের তৎপরতা রিফাতুর রহমানের সঙ্গে প্রতারণা চক্রের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে রায়হান চৌধুরী নামে ওই ব্যক্তি কথিত চক্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।

তদন্তে আরও বড় চক্রের সন্ধান?

মামলার বাদী জাহাঙ্গীরের দাবি, তদন্তে প্রতারণার ঘটনায় আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে ‘মেসার্স আই এস টেলিকম’ নামে সিটি ব্যাংকের একটি যৌথ হিসাবের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হিসাবের সঙ্গে মো. রোকন উদ্দিন ও প্রবাল কর নামের দুই ব্যক্তি জড়িত এবং সেখানে প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়ে থাকে।

তবে ওই হিসাবের লেনদেনের সঙ্গে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে প্রতারণার অর্থের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অনলাইন প্রতারণার ফাঁদ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনলাইন ব্যবসা, টাস্কভিত্তিক কাজ, বিনিয়োগ ও দ্রুত লাভের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার একাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে প্রথমে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

শুরুতে অল্প পরিমাণ টাকা দিয়ে লাভের সুযোগ দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জনের পর ধাপে ধাপে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। অ্যাকাউন্টে কৃত্রিমভাবে বড় অঙ্কের ব্যালেন্স দেখিয়ে আরও টাকা জমা দিতে বাধ্য করা এবং শেষপর্যায়ে টাকা উত্তোলনের সময় নতুন শর্ত আরোপ—এ ধরনের কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

জাহাঙ্গীরের মামলাটিও এমন একটি চক্রের সম্ভাব্য কার্যক্রমের উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

তবে মোহাম্মদ হাসান, রিফাতুর রহমানসহ মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে। একইভাবে ব্যাংক হিসাবের মালিকদের সঙ্গে প্রতারণার অর্থের সম্পর্ক, কথিত লেয়ারিং এবং সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে প্রমাণিত হলে তবেই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

ডিবির তদন্তে এই চক্রের অর্থের উৎস, লেনদেনের গতিপথ, কথিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রকৃত পরিচয় এবং এর সঙ্গে আরও কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন ভুক্তভোগী।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!