ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

menu

১৪তম গ্রেডের চাকরি, চার কোটি টাকার প্রাসাদ: ফরিদপুর গণপূর্তের ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীরের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম

১৪তম গ্রেডের চাকরি, চার কোটি টাকার প্রাসাদ: ফরিদপুর গণপূর্তের ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীরের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

ছবিঃ সংগৃহীত

সরকারি চাকরির পদবি ‘উচ্চমান হিসাব সহকারী’, বেতন স্কেল ১৪তম গ্রেড। দুই দশকের চাকরিজীবনে বেতন-ভাতা থেকে অর্জিত বৈধ আয়ের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পদের যেন কোনো মিলই নেই। ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের ক্যাশিয়ার মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে উঠেছে এমনই গুরুতর অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই দপ্তরে ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ, বিভিন্ন নথি ও আর্থিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে একটি ‘কমিশন সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছেন। তার বিরুদ্ধে বিল পাসে ৫ শতাংশ কমিশন দাবি, বিভিন্ন কাজে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং নির্ধারিত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ঠিকাদারদের হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে।

অন্যদিকে অনুসন্ধানে তার নিজ এলাকা ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী এলাকায় প্রায় চার কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল চারতলা বাড়ি, ফরিদপুর শহরে প্রায় ৬০ লাখ টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট এবং নিজের ও স্ত্রীর নামে একাধিক জমি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জাহাঙ্গীর আলম। তার দাবি, দৃশ্যমান সম্পদ তিনি বৈধ আয়, ব্যাংকঋণ ও পারিবারিক সহায়তার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন।

বিল পাসে ৫ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ

একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, গণপূর্ত বিভাগের কাজের বিল পাসের ক্ষেত্রে ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীর আলমকে নির্ধারিত হারে কমিশন দিতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিলের বিপরীতে প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করা হয়।

শুধু বিল পাস নয়, প্রাক্কলন বা এস্টিমেট প্রস্তুত, ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন, নতুন লাইসেন্স-সংক্রান্ত কাজসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায়ও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।

তাদের দাবি, কেউ দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে রাখা কিংবা কাজের প্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্ব করা হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে নথিভুক্ত প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

২০ বছরের চাকরি, সম্পদের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন

সরকারি চাকরিতে ১৪তম গ্রেডের মূল বেতন দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন জাহাঙ্গীর আলম। প্রাথমিক হিসাবে ১০ হাজার ২০০ টাকা মূল বেতন ধরে ২০ বছরের মোট মূল বেতন দাঁড়ায় প্রায় ২৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। অবশ্য সময়ের সঙ্গে বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা, উৎসব ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয় এতে যুক্ত হবে।

কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া তার দৃশ্যমান সম্পদের বিবরণ সামনে এনে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা—এই সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস কী?

তবে শুধু মূল বেতন দিয়ে কারও মোট বৈধ আয় নির্ধারণ করা যায় না। তাই তার সম্পদের বৈধতা যাচাই করতে আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ, ঋণ, সম্পদ বিবরণী এবং জমি-ফ্ল্যাটের ক্রয়মূল্যসহ সংশ্লিষ্ট দলিল পর্যালোচনা প্রয়োজন।

কামারখালীতে প্রায় চার কোটি টাকার বাড়ি

সরেজমিনে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নসংলগ্ন এলাকায় জাহাঙ্গীর আলমের একটি দৃষ্টিনন্দন চারতলা বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, বাড়িটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় চার কোটি টাকা।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কামারখালী ও আশপাশের এলাকায় নিজের পাশাপাশি স্ত্রীর নামেও একাধিক জমি রয়েছে জাহাঙ্গীরের।

তবে মোট কত জমি তার নিজের ও স্ত্রীর নামে রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব জানতে স্থানীয় ভূমি অফিসে তথ্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি।

শহরে ৬০ লাখ টাকার ফ্ল্যাট

গ্রামের বাড়ির পাশাপাশি ফরিদপুর শহরেও জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদ রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

শহরের ডিআইবি বটতলা সংলগ্ন ১০ তলা ভবন ‘বর্ণমালা’র চারতলার ৫-এর ‘সি’ ইউনিটে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা।

ভবনের নিরাপত্তাকর্মী কুদ্দুস শেখ জানান, জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।

সম্পদের উৎস নিয়ে জাহাঙ্গীরের ব্যাখ্যা

নিজের সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এসব সম্পদ আমার বৈধভাবে গড়া।’

বাড়ি নির্মাণের অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি দাবি করেন, ব্যাংক থেকে ৬০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। বড় বোনের কাছ থেকে চেকের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা পেয়েছেন। এছাড়া স্ত্রীর নামে সোনালী ব্যাংক থেকে ৮ লাখ টাকা ঋণ এবং নিজের প্রায় ১০ লাখ টাকার সঞ্চয় ব্যবহার করেছেন।

তবে এসব ঋণ ও পারিবারিক আর্থিক সহায়তার সমর্থনে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা সংশ্লিষ্ট নথি দেখাতে পারেননি তিনি।

প্রতিবেদন না করার অনুরোধ ও অর্থ দেওয়ার চেষ্টা

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার সময় জাহাঙ্গীর আলম সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।

পরবর্তীতে সংবাদটি প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, সংবাদ প্রকাশে প্রভাব বিস্তারের এমন প্রচেষ্টা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে জাহাঙ্গীরের বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও অর্থ দেওয়ার চেষ্টার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো নথি এই প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্যেও প্রশ্ন

কামারখালী ১ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চৌধুরী ইরান হোসেন বলেন, জাহাঙ্গীর আলমের বাবা ভূমি কর্মকর্তা ছিলেন। তবে তার বাবার রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ এমন ছিল না যে, তা থেকে বর্তমানের মতো বড় সম্পদ গড়ে তোলা সহজ।

তবে এসব সম্পত্তি জাহাঙ্গীর আলমের নিজের নামে নাকি পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে—সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি তিনি।

অভিযোগ সঠিক নয় বলছে গণপূর্ত বিভাগ

ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খায়রুজ্জামান বলেন, তার জানা মতে ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সঠিক নয়।

তবে জাহাঙ্গীর আলমের ব্যক্তিগত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ কিংবা এসব সম্পদের অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য জানেন না বলে জানান।

যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন

জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং তার সম্পদের প্রকৃত উৎস নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি—তার আয়কর রিটার্নে ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ কত, গত ২০ বছরে তার মোট বৈধ আয় কত, নিজের ও স্ত্রীর নামে থাকা জমি-ফ্ল্যাটের ক্রয়মূল্য কত, ব্যাংকঋণের প্রকৃত পরিমাণ ও ব্যবহার কী এবং এসব সম্পদের সঙ্গে ঘোষিত আয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না।

একই সঙ্গে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বিলের নথি, ব্যাংক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বক্তব্য এবং গণপূর্ত বিভাগের আর্থিক রেকর্ড পর্যালোচনা প্রয়োজন।

অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে তা সরকারি চাকরিজীবীর দায়িত্ব পালনে অনিয়ম, ঘুষ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। আর অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্পদের বৈধ উৎসের নথিপত্র প্রকাশের মাধ্যমেই সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়া সম্ভব।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!