বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন প্রকল্পে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। তবে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর নারায়ণগঞ্জ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নকশা জালিয়াতি, অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন, রাজস্ব ফাঁকি, গ্রাহকদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফয়েজ করিমের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি বন্ধ ঘোষণা করা এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, সরকারি নীতিমালা ও প্রকৌশলগত মানদণ্ড উপেক্ষা করে এমন একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ। একই সঙ্গে সাধারণ গ্রাহকদেরও বহন করতে হয়েছে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর দায়িত্বে থেকে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করেন ফয়েজ করিম। ওই সময় তিনি ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি লাভ করেন এবং একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এই সময়ের মধ্যেই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে দাবি করা হয়েছে, নোয়াখালীর সুধারাম উপজেলার বাসিন্দা আবুল হাশেমের ছেলে মোহাম্মদ ফয়েজ করিম ২০০৮ সালের ৩০ জুন ডিপিডিসিতে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন। মাত্র ১৬ বছরের চাকরিজীবনে তিনি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে পাঁচতলা ভবন, রাজধানীর মাতুয়াইলে আটতলা ভবন, বেইলি রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, বুলগেরিয়ায় ফ্ল্যাট ও দোকান এবং নোয়াখালী ও গাজীপুরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব তথ্যের স্বপক্ষে আরও দলিল-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে বলে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা-চাষাড়া এলাকায় ‘আশা সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর আবাসন প্রকল্পে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, অনুমোদিত নকশায় যেখানে মাত্র চারটি বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপনের অনুমতি ছিল, সেখানে বাস্তবে স্থাপন করা হয়েছে ৪৫টি খুঁটি। অতিরিক্ত ৪১টি খুঁটি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি রাজস্ব আদায় করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে রাজস্ব জমা দেওয়া হলেও সেই অর্থ গ্রাহকের কাছ থেকেই আদায় করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রকল্প এলাকায় বালুভরাট নরম জমিতে পর্যাপ্ত কারিগরি ও নিরাপত্তা সমীক্ষা ছাড়াই বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের স্থাপনা ভবিষ্যতে জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণেও অসংগতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ। প্রাক্কলনে ‘সুপারভিশন চার্জ’ বাবদ ২০ শতাংশ এবং ‘সার্ভিস চার্জ’ বাবদ ২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত করা হলেও এর কোনো সুস্পষ্ট নীতিগত বা আইনি ভিত্তি পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদেরই বহন করতে হয়েছে।
শুধু প্রকল্প নয়, মতিঝিল, বনশ্রী ও কুতুবপুর এলাকায়ও ফয়েজ করিমের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, মিটার বিকল হওয়ার অজুহাতে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও গ্রাহকের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করা হয়েছে। কুতুবপুরের বাসিন্দা মনিরুল হক অভিযোগ করেছেন, একটি ছোট বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য তাকে ৩০ লাখ টাকা নগদ দিতে বাধ্য করা হয়। তার দাবি, এই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএনডিসি (CNDC)-এর কয়েকজন কর্মীও নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, মাঠপর্যায়ে তারা মূলত নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়েজ করিমের নির্দেশনাতেই কাজ করেছেন। স্থানীয় কর্মকর্তাদের আপত্তি থাকলেও কাজ বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল আমিনের বিরুদ্ধেও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফয়েজ করিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একইভাবে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুন নাহারের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "দেশে দুর্নীতি দমনের জন্য আইন ও বিধিমালা থাকলেও প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে তার কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে। কেবল বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, দুর্নীতি দমন কমিশনকে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।"
ডিপিডিসির উন্নয়ন প্রকল্পে ওঠা এসব অভিযোগ যদি নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির বড় সংকটেরও ইঙ্গিত বহন করবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি নিরীক্ষা, সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

