স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। তবে এই সাফল্যের সঙ্গে অর্থনীতির সামনে হাজির হচ্ছে নতুন বাস্তবতা। শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানো, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়া, বৈদেশিক ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ—সব মিলিয়ে এলডিসি-পরবর্তী সময়কে অর্থনীতির জন্য কঠিন পরীক্ষার সময় বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার জাতিসংঘের কাছে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত করার আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। সরকারের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় অতিরিক্ত সময় বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতার মধ্যে এলডিসি সুবিধা একযোগে হারালে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। এলডিসি সুবিধা হারালে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সীমিত হবে, ফলে রপ্তানি ব্যয় বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শুল্ক নয়, রুলস অব অরিজিন, স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশনের মতো শর্ত পূরণ করাও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
দেশীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং শিল্পকেও এলডিসি-পরবর্তী সময়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, এই খাতে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে সুতা ও কাপড় উৎপাদনের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। তবে সস্তা সুতা আমদানি বৃদ্ধি এবং নীতিগত সহায়তার অভাবে স্থানীয় শিল্প চাপে রয়েছে।
এদিকে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট নতুন বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে সহজ শর্তের বৈদেশিক ঋণ কমে গেলে উন্নয়ন ব্যয় ও অবকাঠামো বিনিয়োগেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এখনই ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ প্রধান বাজারগুলোর সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করা জরুরি।
তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে আধুনিক এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, পর্যটন ও ব্লু ইকোনমিতে বিনিয়োগ বাড়ানোরও আহ্বান জানান।
অন্যদিকে জাতিসংঘের ইকোসক অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতিরিক্ত সময় চাওয়া কোনো বিলাসিতা নয়; বরং টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য এটি অপরিহার্য।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়াবে, কিন্তু প্রস্তুতি ছাড়া এই অর্জন স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপও সৃষ্টি করতে পারে। তাই রপ্তানি বহুমুখীকরণ, স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করাই হতে পারে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার প্রধান কৌশল। সঠিক পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশ শুধু চ্যালেঞ্জই মোকাবিলা করবে না, বরং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ারও উন্মোচন করতে পারবে।

