ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

একক করদাতা নম্বর চায় আইএমএফ: এনবিআরের রাজস্ব ব্যবস্থায় আসছে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুলাই ২৯, ২০২৬, ১০:৩৯ এএম

একক করদাতা নম্বর চায় আইএমএফ: এনবিআরের রাজস্ব ব্যবস্থায় আসছে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসনকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি বলেছে, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসসহ সব ধরনের কর ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে। এজন্য বর্তমানে ব্যবহৃত পৃথক ই-টিআইএন (e-TIN) ও বিআইএন (BIN) নম্বরের পরিবর্তে চালু করতে হবে একক করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (Single Taxpayer Identification Number)।

আইএমএফের মতে, এই ব্যবস্থা চালু হলে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়কর, ভ্যাট, কাস্টমস, আমদানি-রপ্তানি, উৎসে কর কর্তন, ব্যাংকিং তথ্য এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেন একটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এতে কর প্রশাসনের দক্ষতা যেমন বাড়বে, তেমনি কর ফাঁকি শনাক্ত করাও অনেক সহজ হবে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এবং কর ও কাস্টমস বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। বৈঠকের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় কোথায় সমস্যা?

বর্তমানে বাংলাদেশে আয়করদাতাদের জন্য ইলেকট্রনিক ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (ই-টিআইএন) এবং ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য দুটি ভিন্ন ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকায় করদাতার প্রকৃত আর্থিক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। ফলে তথ্য বিশ্লেষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, কর নিরীক্ষা এবং কর ফাঁকি শনাক্তকরণ কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়ে।

একক নম্বর চালু হলে করদাতার সব তথ্য একই ডাটাবেজে যুক্ত থাকবে। ফলে আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট রিটার্ন, কাস্টমস তথ্য, ব্যাংকিং লেনদেন, উৎসে কর কর্তন, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমসহ সব তথ্য এক জায়গা থেকেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।

কর ফাঁকি রোধে কার্যকর অস্ত্র

আইএমএফ মনে করছে, একক করদাতা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু হলে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা (Risk-Based Audit) আরও কার্যকর হবে।

একজন করদাতা আয়কর রিটার্নে যে আয় দেখাচ্ছেন, তার সঙ্গে ভ্যাট রিটার্ন, আমদানি-রপ্তানি তথ্য কিংবা ব্যাংকিং লেনদেনের অসঙ্গতি সহজেই শনাক্ত করা যাবে। এতে কর ফাঁকি, ভুয়া লেনদেন এবং আয় গোপনের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

একই সঙ্গে করদাতাদের জন্যও এটি হবে বড় সুবিধা। একাধিক নম্বর ব্যবহার না করে একটি পরিচয় নম্বর দিয়েই সব ধরনের কর-সংক্রান্ত সেবা গ্রহণ করা যাবে।

পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থার সুপারিশ

বৈঠকে আইএমএফ শুধু একক করদাতা নম্বর চালুর সুপারিশই করেনি; বরং পুরো রাজস্ব প্রশাসনকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের ওপর জোর দিয়েছে।

সংস্থাটি বলেছে, এনবিআরের তথ্যভাণ্ডারকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি), বাংলাদেশ ব্যাংক, ভূমি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস, আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযুক্ত করতে হবে।

এতে ব্যবসা নিবন্ধন, ব্যাংকিং কার্যক্রম, সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়, আমদানি-রপ্তানি ও কর প্রদানের তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে চলে আসবে। ফলে প্রকৃত করযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এছাড়া অনলাইনে আয়কর রিটার্ন, ই-পেমেন্ট, উৎসে কর কর্তন এবং তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা চালুর ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফলভাবে চালু

আইএমএফ জানিয়েছে, বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে একক করদাতা পরিচয় ব্যবস্থা চালু করেছে।

ভারতের পার্মানেন্ট অ্যাকাউন্ট নম্বর (PAN), নেপালের PAN, সিঙ্গাপুরের Unique Entity Number (UEN), অস্ট্রেলিয়ার Australian Business Number (ABN) এবং নিউজিল্যান্ডের IRD Number দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এসব দেশে কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং করদাতা সেবা সহজ করতে এই ব্যবস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, একক করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর চালু হলে রাজস্ব প্রশাসন ও করদাতা—উভয় পক্ষই লাভবান হবে।

তার মতে, ব্যবসা নিবন্ধন, ভ্যাট, আয়কর, উৎসে কর কর্তন এবং অন্যান্য কর-সংক্রান্ত তথ্য যদি একটি নম্বরে একীভূত করা যায়, তাহলে এনবিআরের সমন্বয় সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে। কর ফাঁকির সুযোগ কমবে এবং করদাতাদেরও বিভিন্ন সেবা নিতে আলাদা আলাদা নম্বর ব্যবহার করতে হবে না।

তিনি আরও বলেন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তরে এ উদ্যোগ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।

এনবিআরের প্রস্তুতি

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়নে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম চলছে। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কৌশলে অটোমেশন, তথ্য সমন্বয় এবং করদাতা সেবাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তাদের ভাষ্য, আইএমএফ ২০০৫ সাল থেকেই আয়কর ও ভ্যাটের পৃথক পরিচয় নম্বর একীভূত করার সুপারিশ করে আসছে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় এটি তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

প্রথমে আয়কর ও ভ্যাট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, তথ্যভাণ্ডারের সমন্বয় এবং ডিজিটাল অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে। এরপর ধাপে ধাপে একক করদাতা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

বর্তমানে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং দল বাংলাদেশ সফর করছে। দলটি রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার, কর আহরণ বৃদ্ধি, ডিজিটাল আধুনিকায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়াতে, কর ফাঁকি কমাতে এবং একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একক করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর চালুর উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং সুপরিকল্পিত বাস্তবায়ন কৌশল।

 

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!