ক্ষমতাচ্যুত ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন—এমন দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পেট্রাপোল হয়ে বাংলাদেশের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশের পরিকল্পনা নিয়ে দলীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি চলছে।
সংবাদমাধ্যম টাইমস অব বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের নেতাদের বরাতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। তবে তার সম্ভাব্য দেশে ফেরার বিষয়ে বাংলাদেশ বা ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা
আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেন। এ নিয়ে দলীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য কর্মসূচি ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে তারা জানিয়েছেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে ফেরার আগে আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে নয়াদিল্লিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে শেখ হাসিনা তার দেশে ফেরার সম্ভাব্য নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে পারেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই হবে তার প্রথম প্রকাশ্য উপস্থিতি—এমন দাবিও করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।
এর আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কলকাতায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সমাবেশ
টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে এবং তার সঙ্গে দেশে ফেরার প্রস্তুতি হিসেবে প্রবাসে থাকা আওয়ামী লীগের প্রায় ৬০ জন নেতা ইতোমধ্যে কলকাতায় অবস্থান করছেন।
সেখানে তারা নিয়মিত বৈঠক করছেন এবং অনলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। একই সঙ্গে কর্মীদের সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় থাকার নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে বলে আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করেছেন।
দলীয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে ফেরার সময় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে সঙ্গে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলে প্রবাসে থাকা নেতাকর্মীদের নিয়ে একটি চার্টার্ড বিমানে দেশে ফেরার প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে।
প্রবেশে বাধা দিলে পশ্চিমবঙ্গে থাকার পরিকল্পনা
আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধার মুখে পড়লে তিনি দিল্লিতে ফিরে না গিয়ে পশ্চিমবঙ্গেই অবস্থান করতে পারেন। সেখান থেকেই দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
দলের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ১৯৮১ সালে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও শেখ হাসিনা যেভাবে দেশে ফিরেছিলেন, এবারও তিনি প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে দেশে ফিরবেন।
তবে বাংলাদেশে তার প্রবেশের ক্ষেত্রে বর্তমান আইনগত ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হবে, সে বিষয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের এসব বক্তব্যের বাইরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
দিল্লি থেকে কলকাতা যাওয়ার আগে ধর্মীয় স্থাপনা জিয়ারতের পরিকল্পনা
দলীয় সূত্রের বরাতে টাইমস অব বাংলাদেশ জানিয়েছে, দিল্লি থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার আগে শেখ হাসিনা নিজামুদ্দিন আউলিয়া ও আজমির শরিফ জিয়ারত করতে পারেন।
এ সময় তার সঙ্গে বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল থাকার কথা রয়েছে বলেও সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সফরের সময়সূচি, যাত্রাপথ কিংবা পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি।
গ্রেপ্তার হলে নেতৃত্বে কে?
শেখ হাসিনা দেশে ফিরে গ্রেপ্তার হলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়েও দলীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে বলে নেতারা জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠতম সদস্য ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনগত পরিস্থিতিতে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর।
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার খবর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার দেশে ফেরার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা রাজনৈতিক ও আইনগত—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের পরিকল্পনা, তার বিরুদ্ধে চলমান ও নিষ্পত্তি হওয়া মামলার পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সম্ভাব্য অবস্থান—সবকিছুই তখন আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে।
তবে ডিসেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে শেখ হাসিনা সত্যিই বাংলাদেশে ফিরবেন কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো সরকারি ঘোষণা নেই। ফলে আওয়ামী লীগ নেতাদের দেওয়া তথ্যকে আপাতত তাদের দলীয় পরিকল্পনা ও দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সংক্ষেপে: আওয়ামী লীগের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার দাবি, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে বা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। অক্টোবরের মাঝামাঝি নয়াদিল্লিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে বলেও তারা জানিয়েছেন। তবে তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।

