জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, শেখ হাসিনার এই মাটিতে কোনোদিন সমাধি হবে না এবং তাঁর ফিরে আসার কোনো সমাদরও হবে না। তাঁর ভাষ্য, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও শাসনামলের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কর্মফলই তাঁর পতনের কারণ হয়েছে।
একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কমিটির মতো করে জেলা পরিষদ পরিচালনা করা হলে সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র ও জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারে আয়োজিত এনসিপির সাংগঠনিক সমন্বয় সভায় এসব কথা বলেন সারজিস আলম।
পার্বত্য তিন জেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচনের দাবি
সারজিস আলম বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হলেই জেলা পরিষদের প্রতি মানুষের আস্থা ও জবাবদিহি বাড়বে।
তিনি বলেন, ‘সবার আগে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই জেলা পরিষদ পরিচালিত হওয়া উচিত।’
পার্বত্য জেলা পরিষদের বর্তমান কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যেভাবে এসব পরিষদ গঠন ও পরিচালনা করা হচ্ছে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। পার্বত্য তিন জেলায় জেলা পরিষদের গুরুত্ব অনেক বেশি হওয়ায় এর নেতৃত্ব ও সদস্য নির্বাচনের প্রক্রিয়াও হতে হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক।
সারজিসের প্রশ্ন, কোনো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কমিটির আদলে জেলা পরিষদ পরিচালিত হলে সেখানে জনগণের মতামত ও প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত হবে?
‘কোটি টাকা খরচ করে পদ নিলে দুর্নীতির প্রবণতা তৈরি হবে’
জেলা পরিষদের সদস্য পদে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন এনসিপির এই নেতা।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি কোটি টাকা খরচ করে একটি পদে আসেন, তাহলে সেই অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এর ফলে দুর্নীতি, লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়বে।
তাঁর মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জনপ্রতিনিধিত্বের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে জনগণের ভোট ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হলে দলীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের পরিবর্তে জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিন পার্বত্য জেলায় ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতালের দাবি
পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবার দুরবস্থার কথাও তুলে ধরেন সারজিস আলম। তাঁর মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষকে চিকিৎসার জন্য জেলা সদরে আসতেই দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি রোগীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়।
এ কারণে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—প্রতিটি জেলায় অন্তত ৫০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তিনি।
সারজিস বলেন, প্রত্যন্ত এলাকার একজন মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদরে আসতে যে সময় লাগে, সেই সময়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া সম্ভব। তাই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে আধুনিক হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা গড়ে তোলা জরুরি।
তিনি মনে করেন, শুধু হাসপাতাল নির্মাণ করলেই হবে না; সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, জরুরি বিভাগ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করতে হবে।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের আহ্বান
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সারজিস আলম।
তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় পার্বত্য এলাকার অনেক মানুষ এখনো মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে রয়েছে। দুর্গম এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও আধুনিক শিক্ষা উপকরণের ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পাচ্ছে না।
তাই তিন পার্বত্য জেলার স্কুল, কলেজ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীও যেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়ার স্বপ্ন দেখতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে।
‘এত বড় বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে?’
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে বড় অঙ্কের সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রত্যন্ত এলাকার বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সারজিস আলম।
তিনি বলেন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বড় বড় বরাদ্দের কথা বলা হলেও প্রত্যন্ত গ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
এ কারণে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এত বড় বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে?
তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কী কাজ হচ্ছে এবং জনগণ তার কতটা সুফল পাচ্ছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
‘রাষ্ট্রের সম্পদের বড় অংশ অল্প কিছু মানুষের হাতে’
দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টিও সভায় তুলে ধরেন সারজিস আলম।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ও সম্পদের বড় একটি অংশ অল্প কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে আছে। মধ্যস্বত্বভোগী একটি শ্রেণি এই ব্যবস্থার সুবিধা পেলেও দেশের বড় অংশের মানুষ ঋণ ও ধার করে সংসার চালাচ্ছে।
অনেক পরিবারকে সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সারজিস বলেন, এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে। মানুষের অধিকার ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত থাকতে হবে।
তাঁর ভাষায়, ‘এই সিস্টেমটা ভাঙতে হবে। যদি মনে হয় এটাই সত্য ও বাস্তবতা, তাহলে এই সত্যের জন্য লড়াই করতে হবে। প্রয়োজনে ত্যাগ ও আত্মত্যাগ স্বীকার করতে হবে।’
জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে সারজিস আলম বলেন, ওই আন্দোলনে অনেকে রক্ত দিয়েছেন এবং অনেকে জীবন দিয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশের মানুষ রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এই পরিবর্তনের জায়গা থেকেই এনসিপি নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিবর্তনের রাজনীতি নিয়ে সামনে এসেছে বলে জানান সারজিস।
তিনি বলেন, রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রের সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। দলীয় কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপি সরকারের ছয় মাস নিয়েও প্রশ্ন
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে সারজিস আলম বলেন, বিএনপি দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধা হিসেবে বিএনপির কাছ থেকে জনগণের প্রত্যাশা ছিল, ক্ষমতায় গিয়ে তারা জুলুম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও লুটপাটের রাজনীতি করবে না।
তবে তাঁর দাবি, ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, জনগণ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, সেই প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে কঠোর মন্তব্য
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করে সারজিস আলম বলেন, তাঁর শাসনামলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডসহ তাঁর সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পতন ঘটেছে।
সারজিস বলেন, ‘শেখ হাসিনার এই মাটিতে কোনোদিন সমাধি হবে না, ফিরে আসার কোনো সমাদরও হবে না। তাঁর কর্মফলই তাঁর পতনের কারণ।’
তবে তাঁর এসব বক্তব্য রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দেওয়া মন্তব্য হিসেবে এসেছে।
‘ছোট স্বার্থ নয়, বড় করে চিন্তা করতে হবে’
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের উন্নয়ন নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বৃহত্তর চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন সারজিস আলম।
তিনি বলেন, দলীয় ও গোষ্ঠীগত বিভাজন কিংবা ছোট ছোট স্বার্থকে সামনে না এনে রাষ্ট্র ও জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তাঁর প্রত্যাশা, একজন কৃষক, একজন জেলে কিংবা একজন অধ্যাপক—পেশা ও আর্থিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, প্রত্যেক নাগরিক যেন নিজের সন্তানকে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়ানোর স্বপ্ন দেখতে পারেন।
‘আমরা ছোট ছোট স্বার্থ নিয়ে বিভক্ত না হয়ে বড় করে চিন্তা করতে চাই’—বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সভায় এনসিপির নেতাকর্মীদের উপস্থিতি
এনসিপির সাংগঠনিক সমন্বয় সভায় কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব (দপ্তর) সারোয়ার তুষার, কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার, এনসিপি চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজাউদ্দীনসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া শ্রমিক শক্তি রাঙামাটি জেলা শাখার সংগঠক মো. আমির উদ্দিন চৌধুরী, জাতীয় যুব শক্তির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রিফাত রশিদ, এনসিপি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক প্রিয় চাকমা, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সাহেদুল আলম শাকিল এবং শ্রমিক শক্তি রাঙামাটি জেলা কমিটির সহসভাপতি রিন্টু দেওয়ানসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা সভায় অংশ নেন।
সংক্ষেপে মূল বক্তব্য
সারজিস আলমের বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিশেষ বিনিয়োগ, উন্নয়ন বরাদ্দে স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে এনসিপির পরিবর্তনের রাজনীতির অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

