বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ তারা একসঙ্গে কাজ করছেন। সংসদের ভেতরে-বাইরে এবং বিগত নির্বাচনে এনসিপির সঙ্গে একযোগে লড়াই করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। এ সময় এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, ডা. মাহমুদা মিতু এমপিসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। জামায়াত আমিরের সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও প্রচার কমিটির সদস্য মুহাম্মদ জাহিদুর রহমান।
দেশ ও জনগণের জন্য একসঙ্গে কাজের কথা জানালেন শফিকুর রহমান
এনসিপি কার্যালয় পরিদর্শন শেষে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা দেশ ও জনগণের জন্য এনসিপিসহ একসঙ্গে কাজ করছি। সংসদের ভেতরে ও বাইরে এবং বিগত নির্বাচনে একসঙ্গে লড়াই করেছি।’
তিনি বলেন, দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূর করা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সেই জায়গা থেকেই এনসিপির সঙ্গে তাদের কাজের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
গঠনমূলক বিরোধীদলের ভূমিকা পালনের চেষ্টা
সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, তারা গঠনমূলক বিরোধীদল হিসেবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন। তার ভাষায়, সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে সরকারি দল ও বিরোধীদল। বিরোধীদল ছাড়া গণতন্ত্র কার্যত শূন্য হয়ে যায়।
তবে সংসদে বিরোধীদল হিসেবে যে অধিকার ও সুযোগ পাওয়ার কথা, তার বড় একটি অংশ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধীদলের মতামত, প্রশ্ন, সমালোচনা ও পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিরোধীদলকে যথাযথ সাংবিধানিক ও সংসদীয় অধিকার দেওয়া না হলে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
সরকারি বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ
সংসদের বাইরেও বৈষম্য পাকাপোক্ত হচ্ছে বলে দাবি করেন জামায়াত আমির। বিশেষ করে ৩০০ সংসদীয় আসনের উন্নয়ন তহবিল বা ফান্ডের বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারি দল ও বিরোধীদলের এমপিদের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকারি বরাদ্দ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। জনগণের করের টাকা থেকেই এসব বরাদ্দ দেওয়া হয়। তাই দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্য করা উচিত নয়।
নির্বাচনের আগে সরকারি দল বৈষম্য না করার এবং দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার কথা বলেছিল—এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
‘উন্নয়ন নাগরিক অধিকার’
দেশের উন্নয়নকে নাগরিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একটি দেশের কোনো অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে যদি বৈষম্য তৈরি হয়, তাহলে ধীরে ধীরে সামাজিক অসন্তোষ বাড়তে পারে।
তার মতে, উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে বৈষম্য থাকলে সমাজে ক্ষোভ ও অনাস্থা তৈরি হয়। আর স্থিতিশীল সামাজিক পরিবেশ ছাড়া কোনো দেশ টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারে না।
তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন নাগরিক অধিকার। একটি দেশে বৈষম্য তৈরি হলে সামাজিক অসন্তোষ দেখা দেয়। স্থিতিশীল সমাজ গড়ে না উঠলে দেশ কখনো এগিয়ে যেতে পারবে না।’
এ ধরনের স্থিতিশীল ও বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরির মূল দায়িত্ব সরকারি দলের ওপর বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংরক্ষিত নারী এমপিদের নিয়েও অভিযোগ
সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও আসন ব্যবস্থাপনাতেও বৈষম্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের বিরোধীদলের এমপিদের আসনে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে বসানো হয়েছে। সংসদে আসন ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও যদি দলীয় বৈষম্য থাকে, তাহলে তা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক নয় বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমানের ভাষায়, এভাবে একটি দেশ ও জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি
জামায়াত আমির বলেন, তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে জনগণের দাবি এবং গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন করছেন। সংসদের ভেতরে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলোর সমাধান চেয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।
তবে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও অবস্থানের কারণে তাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, জনগণের দাবিগুলো সংসদের ভেতরে আলোচনা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সেই সুযোগ যথেষ্ট না থাকায় আন্দোলনের পথ বেছে নিতে হচ্ছে।
‘নতুন ফ্যাসিবাদ কায়েম হতে দেব না’
দেশে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির।
তিনি বলেন, ‘আমরা কথা দিচ্ছি, বাংলাদেশে আরেকটি নতুন ফ্যাসিবাদ কায়েম হতে দেব না।’
একই সঙ্গে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় জাতীয় নাগরিক পার্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তার বক্তব্যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, সংসদে বিরোধীদলের অধিকার নিশ্চিত করা, উন্নয়নে বৈষম্য দূর করা এবং জনগণের গণরায়ের প্রতি সম্মান দেখানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এনসিপি কার্যালয়ে জামায়াত আমিরের সফর
রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জামায়াত আমিরের এই সফর রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফরকালে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সংসদীয় বিষয়ে মতবিনিময় করেন তিনি।
এ সময় দুই দলের নেতাদের উপস্থিতিতে সংসদের ভেতরে-বাইরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিরোধীদলের অধিকার, জনগণের দাবি এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদে বিরোধীদল হিসেবে জামায়াত ও এনসিপির নেতাদের মধ্যে সমন্বয় এবং যৌথ রাজনৈতিক অবস্থান আগামী দিনের বিরোধীদলীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে এই সহযোগিতা কতটা সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

