রাজধানীর গুলশানে পুলিশ প্লাজার একটি রেস্তোরাঁয় গোপন বৈঠক করার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ছয় নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশ প্লাজার পঞ্চম তলার একটি রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে গুলশান থানা-পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—যশোরের চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী মাসুদ চৌধুরী (৫৫), উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এস এম রেজওয়ান হাবিব আলিফ (৩৩), সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও চৌগাছা মৃধাপাড়া মহিলা কলেজের প্রভাষক নান্নু মিয়া (৩৮), সাবেক ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ নেতা আমিনুর রহমান পলাশ (৪২), মাদারীপুরের আওয়ামী লীগ কর্মী সজল আহমেদ (২৯) এবং চৌগাছা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম হোসেন (৩৩)।
গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাউদ হোসেন গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গোপন বৈঠকের তথ্য পেয়ে অভিযান
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে, গুলশানের পুলিশ প্লাজার পঞ্চম তলার একটি রেস্তোরাঁয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী গোপন বৈঠক করছেন। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ওসি দাউদ হোসেন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বৈঠকের পর রাজধানীতে মিছিল করার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
চৌগাছায় কমিটি গঠনের পরিকল্পনার অভিযোগ
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বৈঠকের মূল আলোচনার বিষয় ছিল যশোরের চৌগাছা উপজেলা ও বিভিন্ন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নতুন কমিটি গঠন।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে মেহেদী মাসুদ চৌধুরীকে সভাপতি এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম সাইফুর রহমান বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি প্রস্তাবিত কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়।
একইভাবে চৌগাছা পৌর আওয়ামী লীগের জন্য সাবেক মেয়র নূর উদ্দিন আল মামুন হিমেলকে সভাপতি এবং এস এম রেজওয়ান হাবিব আলিফকে সাধারণ সম্পাদক করার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া ইব্রাহিম হোসেনকে উপজেলা যুবলীগের সভাপতি এবং আমিনুর রহমান পলাশকে সাধারণ সম্পাদক করার পাশাপাশি চৌগাছা সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাশেমকে সভাপতি এবং নান্নু মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণার পরিকল্পনা ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
কমিটি ঘোষণার পর ঢাকায় মিছিলের পরিকল্পনা
সূত্রগুলোর দাবি, প্রস্তাবিত কমিটিগুলো চূড়ান্ত বা ঘোষণা করার পর রাজধানীতে মিছিল করার পরিকল্পনাও ছিল বৈঠকে।
বৈঠকে চৌগাছা পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি নূর উদ্দিন আল মামুন হিমেল, উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি এস এম সাইফুর রহমান বাবুলসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের উপস্থিত থাকার কথা জানা গেছে।
তবে পুলিশ অভিযান চালাতে যাচ্ছে—এমন খবর পেয়ে উপস্থিত কয়েকজন সেখান থেকে সরে যান বলে সূত্র জানিয়েছে।
নেপথ্যে কারা—খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্টরা
সূত্রের দাবি, কথিত এসব কমিটি গঠনের সমন্বয়ের সঙ্গে নান্নু মিয়ার সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি ভারতে অবস্থানরত অমিত কুমার বসুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং তার নির্দেশনায় এসব কার্যক্রম সমন্বয় করছিলেন বলে সূত্র দাবি করেছে।
এ ছাড়া পলাতক সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল চৌধুরী নওফেলের সাবেক পিএস এবং যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবেও অমিত কুমার বসুর পরিচয় রয়েছে বলে সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে সূত্রের এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আগেও ঢাকায় মিছিলের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, চৌগাছায় কথিত নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থেকেই ঢাকায় বসে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল।
এর আগেও চৌগাছা থেকে বাস রিজার্ভ করে ঢাকায় এসে এসব নেতা-কর্মীর মিছিলে অংশ নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে রাজধানীতে মিছিলের পরিকল্পনার বিষয়টি উঠে এসেছে। এখন তাদের কথিত বৈঠকের উদ্দেশ্য, প্রস্তাবিত কমিটি গঠনের নেপথ্যে কারা ছিলেন এবং পরিকল্পিত মিছিলের সঙ্গে আরও কারা জড়িত ছিলেন—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইনগত প্রক্রিয়া চলমান
গুলশান থানা-পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ছয়জনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বৈঠকে উপস্থিত হয়ে যারা পুলিশের অভিযান টের পেয়ে সরে গেছেন, তাদের পরিচয় ও ভূমিকা সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তবে প্রস্তাবিত কমিটি গঠন কিংবা রাজধানীতে মিছিলের পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার যেসব তথ্য বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে, সেগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা আইনগত তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে।

