দেশের চলমান বিভিন্ন সংকটকে পুঁজি করে কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। সংকট ও সমস্যা আছে—এ কথা সরকার কখনো অস্বীকার করছে না। তবে এসব সমস্যাকে কেন্দ্র করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি ছড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত আলোচনা সভা বিকেল পৌনে ৪টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। অনুষ্ঠানে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তাৎপর্য, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সরকারের দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।

সংকট সমাধানে সরকার কাজ করছে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার বিভিন্ন খাতের বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের চেষ্টা করছে। এসব সমস্যার কোনোটি আগের সরকারের সময় থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে এসেছে, আবার কোনোটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘সমস্যা নেই, তা কখনোই বলছি না। অবশ্যই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। কিন্তু সমস্যাগুলোকে পুঁজি করে কিছু রাজনৈতিক দল এবং কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংকটের বাস্তবতা মোকাবিলার পাশাপাশি সরকারকে যাতে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে না দেওয়া হয়, সে ধরনের অপতৎপরতাও দেখা যাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা ও অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

অরাজকতা সৃষ্টি করলে আইনের আওতায় ব্যবস্থা
নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব ও অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণ সরকারকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। তাই গণতন্ত্রের ধারাকে সমুন্নত রাখা এবং গণতান্ত্রিক নীতি-নৈতিকতা অনুসরণ করাই সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ এই সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে দেশ পরিচালনা করার। অবশ্যই আমরা গণতন্ত্রের ধারাকে সমুন্নত রাখবো। গণতান্ত্রিক নীতি-নৈতিকতাগুলো আপহোল্ড করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।’
তবে কেউ যদি দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করে, সে ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও স্পষ্ট করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়; সেটিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে তা দেশের আইনে বলে দেওয়া আছে।’
এ সময় তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রত্যেকের নিজেদের সীমার মধ্যে থাকা প্রয়োজন।
সংকটকালে জনগণের পাশে বিএনপি: তারেক রহমান
দেশের বিভিন্ন সংকটকালীন সময়ে বিএনপির ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সবসময় দেশের মানুষ ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সংকট মোকাবিলায় কাজ করেছে।
তারেক রহমান বলেন, দেশের প্রতিটি সংকটকালীন মুহূর্তে বিএনপি জনগণের পাশে ছিল। দলটির নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সংকট থেকে দেশকে ধীরে ধীরে বের করে আনার জন্য কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় দলের ওপর বাড়তি দায়িত্ব রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে দুঃখ প্রকাশ
বক্তব্যে দেশের শিল্পকারখানার মালিক ও সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সংকটের বিষয়টিও স্বীকার করেন প্রধানমন্ত্রী। চলমান দুর্ভোগের জন্য তিনি দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘শিল্পকারখানার মালিকসহ বহু সাধারণ মানুষ যারা বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কষ্টে রয়েছেন, তাদের সকলের কাছে আমি দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি।’
তার এই বক্তব্যে সরকার দেশের বিভিন্ন খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের যে বাস্তবতা মোকাবিলা করছে, সেটি স্বীকার করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতার বিষয়টিও উঠে আসে।
বিভ্রান্তি ও গুজব নিয়ে সতর্কবার্তা
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের চলমান সমস্যা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তার অভিযোগ, কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিদ্যমান সংকটকে কেন্দ্র করে এমনভাবে তথ্য ও বক্তব্য উপস্থাপন করছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার বিষয়ে সরকার অবগত। এসব সমস্যা সমাধানে কাজও চলছে। কিন্তু বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা হলে তা আইন অনুযায়ী মোকাবিলা করা হবে।
গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার গণতান্ত্রিক নীতি-নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
তার বক্তব্যে একদিকে যেমন সরকারবিরোধী অরাজকতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা রয়েছে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও উঠে এসেছে।
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে মূলত দেশের চলমান সংকট, সরকারের দায়িত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট এবং অরাজকতা সৃষ্টির অভিযোগ—এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
সরকারের সামনে থাকা বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখাই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

