আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সহানুভূতি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে গুম বা ‘এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’-এর মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এ বছরের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য— ‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’। দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় প্রধানমন্ত্রী গুমকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি শুধু একজন ব্যক্তির অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়; বরং এর সঙ্গে একটি পরিবার ও সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে।
গুম মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক গুমের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত রাখতেই প্রতিবছর আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংঘাত ও দমন-পীড়নের পরিবেশে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থার মাধ্যমে আটক করে তার অবস্থান অস্বীকার করা কিংবা তাকে গোপনে আটকে রাখা আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করে। একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার জানে না তিনি জীবিত নাকি মৃত। ফলে স্বাভাবিক শোক প্রকাশের সুযোগও অনেক সময় থাকে না।
‘আয়নাঘর’ প্রসঙ্গ তুলে বিগত সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ
বাংলাদেশের বিগত সরকারের বিরুদ্ধে গুম ও অপহরণের অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার দমন করতে গুম-অপহরণের পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল। তার দাবি, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর আটকে রাখার জন্য গোপন বন্দিশালা তৈরি করা হয়েছিল, যা জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে কমপক্ষে সাত শতাধিক মানুষকে গুম করা হয়েছে। বর্তমান সরকার এসব অভিযোগের তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও তিনি জানান।
তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হওয়া জরুরি—এমন নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে সরকার গুমের ঘটনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলছে।
গুম প্রতিরোধে নতুন আইনি কাঠামোর উদ্যোগ
ভবিষ্যতে দেশে গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স প্রতিরোধে পৃথক ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে। এসব আইনি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গুম প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের প্রতিকার এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুমের মতো অপরাধ প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
পরিবারের কষ্টের কথা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুম বা অপহরণ শুধু কোনো ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সাধ ও আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু জড়িয়ে থাকে।
একজন স্বজন নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করতে হয়। কখনো তারা বিভিন্ন দপ্তরে ছুটে বেড়ান, কখনো হাসপাতাল, কারাগার কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে তথ্য খোঁজেন। কিন্তু কোনো নিশ্চিত তথ্য না পাওয়ায় তাদের অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘ হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের ন্যায়বিচারের পাশাপাশি মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গণঅভ্যুত্থানের পরও নিখোঁজ অনেকে
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট চক্রের পতনের পর সৌভাগ্যবান কেউ কেউ ফিরে এসেছেন। তবে অনেক নিখোঁজ ব্যক্তির এখনও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তিনি ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের মতো নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, তাদের পরিবার এখনও প্রিয়জনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং পরিবারগুলোকে ন্যায়বিচার দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে।
গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে দেখার আহ্বান
আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সনদের ৭(২) অনুচ্ছেদে গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তাই গুমের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, গুমের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সে জন্য কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন।
বিশ্বজুড়ে ঐক্যের আহ্বান
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের সব রাষ্ট্র, মানবাধিকার সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে গুম প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ভুক্তভোগীদের অধিকার, সত্য উদঘাটন, ন্যায়বিচার এবং পুনরাবৃত্তি রোধ—এই চারটি বিষয়কে সামনে রেখে রাষ্ট্রগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তার আহ্বান, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুমের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার বৈশ্বিক দায়িত্ব। তাই ‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’—এই প্রতিপাদ্যের আলোকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

