চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এ আগামী ১৮ মাসের মধ্যেই প্রথম শিল্পকারখানার উৎপাদন শুরু দেখতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়নে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই প্রথম কারখানা চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
সোমবার (২৭ জুলাই) চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বেলচূড়া এলাকায় বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, এই প্রকল্প শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং এটি বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে এবং দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এক মাসে এক বছরের অগ্রগতি
বেজা চেয়ারম্যান বলেন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেই সফরের পর প্রকল্পের কাজের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তার ভাষায়, "বর্তমানে কাজের যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে এক মাসেই যেন এক বছরের সমান কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।"
তিনি জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনা ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের বৈঠকে প্রথমে জানানো হয়েছিল, শিল্পাঞ্চলটি চালু করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
তবে প্রধানমন্ত্রী সেখানে স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি ১৮ মাসের মধ্যেই এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রথম কারখানার উৎপাদন দেখতে চান।
প্রধানমন্ত্রীর এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রথম কারখানা উৎপাদনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানান আশিক চৌধুরী।
বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন মাইলফলক
বক্তব্যে আশিক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ কেবল অবকাঠামো নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
তিনি বলেন, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের সম্মানিত অতিথি। তারা যেমন নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনা করবেন, তেমনি তাদের বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তার মতে, শিল্পাঞ্চলটি দ্রুত চালু হলে আনোয়ারাসহ পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি আবাসন, পরিবহন, লজিস্টিকস, শিক্ষা ও সেবাখাতেও ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে।
স্থানীয়দের সহযোগিতার আহ্বান
বেজা চেয়ারম্যান স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের প্রতি চীনা বিনিয়োগকারীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, "এই জোন যত দ্রুত চালু হবে, তত দ্রুত বদলে যাবে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র। আমাদের লক্ষ্য দ্রুত শিল্পাঞ্চল চালু করে চট্টগ্রামের মানুষের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।"
তিনি আরও বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে কোনো ধরনের সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বয়ের মাধ্যমে তা দ্রুত সমাধান করতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের অঙ্গীকার
আশিক চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে অবকাঠামো উন্নয়ন, নীতিগত সহায়তা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর বিষয়ে কাজ করছে।
তার মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশকে আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। আর সেই লক্ষ্যেই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে দ্রুত কার্যকর করা হচ্ছে।
উপস্থিত ছিলেন যারা
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি)-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, বেজার কর্মকর্তারা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নির্মিতব্য বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগ, রপ্তানিমুখী শিল্প, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

