নতুন অর্থবছর শুরু হতেই ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাত্র ১৩ দিনেই সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও, অর্থবছরের শুরুতেই ঋণ গ্রহণের এই প্রবণতা রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকারের নেওয়া মোট ঋণের মধ্যে ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ‘ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স’ (Ways and Means Advance) সুবিধার আওতায়। বাকি ৩ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে।
রাজস্ব ঘাটতিই ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সরকারের ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়া। রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নির্বাহে সরকারকে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছর শেষে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা কম রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে পরিকল্পনার চেয়ে বেশি ব্যাংক ঋণ নিতে হয়েছে।
টানা দুই অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই অর্থবছরেই সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি ঋণ নিয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছর: লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু নিট ঋণ নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছর: লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু নিট ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।
এতে স্পষ্ট যে, রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয় বৃদ্ধি সামাল দিতে সরকার ধারাবাহিকভাবে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
ব্যাংক ঋণ বাড়লে কী প্রভাব পড়তে পারে?
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংক ঋণ কিছুটা বৃদ্ধি স্বাভাবিক হলেও এটি যেন নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম না করে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমিয়ে দিতে পারে। এতে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে কর ও ভ্যাট আদায় বাড়ানো এবং রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স’ কী?
সরকারের নেওয়া ঋণের বড় অংশই এসেছে ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স সুবিধার মাধ্যমে।
এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক সরকারের জন্য দেওয়া একটি স্বল্পমেয়াদি নগদ সহায়তা, যা সরকারের দৈনন্দিন আয়-ব্যয়ের সাময়িক ঘাটতি পূরণে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত এই ঋণ ৯০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ ধরনের ঋণ নেওয়া নতুন অর্থ সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় এটি মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে, যদি তা দীর্ঘমেয়াদে বাড়তে থাকে।
সরকারের মোট ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ১.৩৪ লাখ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছর শেষে এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা, যা সরকারি অর্থায়নে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতার চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরামর্শ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, বাস্তবে তা অর্জিত না হওয়ায় সরকারকে ব্যয় নির্বাহে অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ নিতে হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংক ঋণের চাপ কমাতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কর ফাঁকি রোধ, সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় ব্যাংকিং খাতে সরকারের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ বেসরকারি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

