রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এ প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচনার বিষয়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকার জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বিএনপি বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলীয় ফোরামে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার অরাজনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার চিন্তা করছে বিএনপি।
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কেন গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি?
দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, ২০০৭ সালের এক-এগারোর রাজনৈতিক সংকটের সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি না হওয়ায় পরিস্থিতি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারেননি—এমন মূল্যায়ন বিএনপির ভেতরে রয়েছে।
দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তুলনামূলক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। সে কারণেই এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতের সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি চায় না বিএনপি। তাই মাঠের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন ব্যক্তির দিকেই ঝুঁকছে দল।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের হাতে
বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন,
“রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সে বিষয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। বিষয়টি দলের ফোরামে আলোচনা হবে। চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, তিনি একজন গ্রহণযোগ্য, সৎ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ব্যক্তিকেই মনোনয়ন দেবেন।”
তিনি আরও বলেন, “বিতর্কিত কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে না।”
৯০ দিনের আগেই নির্বাচন চায় বিএনপি
সংবিধানের ১২৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। তবে বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দলটি নির্ধারিত সময়সীমার শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায় না।
দলটির মতে, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দ্রুত শেষ করাই হবে সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঝুলিয়ে রেখে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ানোর কোনো সুযোগ রাখতে চায় না সরকার।
সরকার কী বলছে?
শনিবার (২৫ জুলাই) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান বলেন,
“আগামী সেপ্টেম্বরে সংসদের অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মুহূর্তে বিশেষ অধিবেশন ডেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার মতো পরিস্থিতি হয়নি।”
এদিকে সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
যাদের নাম আলোচনায়
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম ঘুরেফিরে আলোচনায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান
এছাড়া কয়েকজন সাবেক আমলার নামও আলোচনায় থাকলেও তাঁদের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।
সম্ভাব্যদের প্রোফাইল যাচাই চলছে
বিএনপির মিডিয়া সেল সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের একাডেমিক যোগ্যতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক ভূমিকা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিস্তারিত প্রোফাইল ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
এসব তথ্য পর্যালোচনার পর দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
মির্জা ফখরুলের বক্তব্য
শনিবার বগুড়ায় এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,
“রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন বা কীভাবে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে, সে বিষয়ে এখনই কিছু বলার সময় আসেনি। সংবিধান অনুযায়ী বিএনপি সিদ্ধান্ত নেবে।”
তিনি জানান, খুব শিগগিরই দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

