ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

ট্যাক্স ক্যাডার থেকে প্রথমবার কমিশনার, রাজস্ব ও আর্থিক স্বচ্ছতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর প্রত্যাশা

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ১৮, ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম

ট্যাক্স ক্যাডার থেকে প্রথমবার কমিশনার, রাজস্ব ও আর্থিক স্বচ্ছতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর প্রত্যাশা

ছবিঃ সংগৃহীত

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য ও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সোমবার (১৭ আগস্ট) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

দুদকের ইতিহাসে এবারই প্রথম ট্যাক্স ক্যাডারের কোনো সাবেক কর্মকর্তাকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। এর আগে ট্যাক্স ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা দুদকের বিভিন্ন পদে প্রেষণে (ডেপুটেশন) দায়িত্ব পালন করলেও কমিশনার পদে সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার নিয়োগকে এ ক্যাডারের জন্য প্রথম ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর বিধান অনুসারে ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ পদে তিনি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারকের সমপর্যায়ের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।

কর প্রশাসন ও আর্থিক খাতে তিন দশকের অভিজ্ঞতা

ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার নতুন দায়িত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর প্রশাসন, করনীতি, আর্থিক প্রতিবেদন, অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা। তিন দশকের বেশি সময়ের কর্মজীবনে তিনি রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) ট্যাক্স ক্যাডারে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর সরকারি চাকরির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২২ সালে ওই পদ থেকে অবসর নেন।

রাজস্ব প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের সময় কর আইন, করনীতি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক বিশ্লেষণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। ক্যাশফ্লো অ্যানালাইসিস, কর আইন ও নীতি এবং আর্থিক স্বচ্ছতা-সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এফআরসির চেয়ারম্যান ছিলেন সাজ্জাদ

এনবিআর থেকে অবসরের পরও আর্থিক খাতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। ২০২৫ সালের ৪ মে তাঁকে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এফআরসি দেশের আর্থিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট পেশাগত মানদণ্ডের উন্নয়ন ও তদারকির সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

ফলে কর প্রশাসনের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দুদকের নতুন দায়িত্বে এসব অভিজ্ঞতা দুর্নীতি অনুসন্ধান, আর্থিক অনিয়ম শনাক্তকরণ এবং অর্থপাচার-সংশ্লিষ্ট তদন্তে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

শিক্ষাজীবনও সমৃদ্ধ

ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। ১৯৮৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে বি.কম (সম্মান) এবং ১৯৮৫ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

এর আগে ১৯৭৯ সালে কুমিল্লার বাতাকান্দি এসএসএএইচএম হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৮১ সালে কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।

ব্যাংকিং ও শিক্ষকতায়ও অভিজ্ঞতা

সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে ব্যাংকিং ও শিক্ষকতা পেশায়ও কাজ করেছেন সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। ১৯৮৭ সালে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরের বছর ১৯৮৮ সালে এবি ব্যাংক পিএলসিতে প্রভিশনারি অফিসার হিসেবে যোগ দেন।

১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে রাজস্ব প্রশাসনে যোগ দিয়ে দীর্ঘ সময় সরকারি দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষাক্ষেত্রের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ও ফিন্যান্স বিভাগসহ ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি), স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের মতো বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ্যাডজাংক্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

তিন সদস্যের নতুন দুদক কমিশন

ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার পাশাপাশি দুদকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। অপর কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ড. জাহাঙ্গীর আলম খানকে।

এর মধ্য দিয়ে নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়ে দুদকের নতুন কমিশন গঠিত হলো।

এর আগে গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যানসহ তিন কমিশনার পদত্যাগ করেন। এরপর কমিশনের শূন্য পদগুলো পূরণে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সদস্যসচিব করে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, সার্চ কমিটি ছয় দফা বৈঠক করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত, যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে। যাচাই-বাছাই শেষে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার হিসেবে এ কে এম আসাদুজ্জামান, ড. জাহাঙ্গীর আলম খান এবং ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার নাম চূড়ান্ত করা হয়।

নতুন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

দুর্নীতি দমন কমিশনের নতুন কমিশনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বড় আর্থিক অনিয়ম, কর ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ, অর্থপাচার এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের মতো বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যাশাও রয়েছে।

বিশেষ করে ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার কর প্রশাসন ও আর্থিক খাতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দুদকের আর্থিক অপরাধ অনুসন্ধান ও তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি নতুন কমিশনের কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা, তদন্তের মান, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত এবং দুর্নীতির অভিযোগে দ্রুত ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতার ওপর।

ট্যাক্স ক্যাডার থেকে প্রথমবারের মতো দুদক কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার সামনে তাই একদিকে যেমন রয়েছে দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ, অন্যদিকে রয়েছে দুর্নীতি দমন ও আর্থিক অপরাধ মোকাবিলায় নতুন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার বড় দায়িত্ব।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!