ব্যাংকে টাকা লেনদেন থেকে শুরু করে জমির খতিয়ান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও পরিবহন—সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ সেবাই যখন দ্রুত অনলাইনভিত্তিক হচ্ছে, তখন দেশের বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো আটকে আছে পুরোনো খাতা-কলমের ব্যবস্থায়। একটি মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ, আদালত পরিবর্তন কিংবা মামলার সর্বশেষ অবস্থান জানতে অনেক ক্ষেত্রেই আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের আদালতে গিয়ে রেজিস্টার খাতা খুঁজতে হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বিস্তারের এই সময়ে বিচারপ্রক্রিয়ার এমন চিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলার তথ্য ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল না হওয়ায় শুধু বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থই নষ্ট হচ্ছে না, বরং প্রশাসনিক জটিলতা, তথ্যের অস্পষ্টতা এবং অনিয়মের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
উচ্চ আদালতে প্রযুক্তির ব্যবহার, অধস্তন আদালতে পিছিয়ে
দেশের বিচারব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ একেবারে নতুন নয়। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হলেও অধস্তন আদালতের দৈনন্দিন মামলা ব্যবস্থাপনায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষ করে মামলার কার্যতালিকা, পরবর্তী শুনানির তারিখ, মামলা এক আদালত থেকে অন্য আদালতে বদলি, নথি সংরক্ষণ ও মামলার অগ্রগতি জানার ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় পুরোনো রেজিস্টারনির্ভর পদ্ধতি চালু রয়েছে।
ফলে কোনো মামলার তথ্য জানতে আইনজীবী বা বিচারপ্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট আদালত ও দপ্তরে সরাসরি যোগাযোগ করতে হয়। বড় শহর, বিশেষ করে ঢাকার অধস্তন আদালতগুলোতে মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় এই সমস্যা আরও প্রকট।
ডিজিটাল উদ্যোগ হয়েছে, স্থায়ী হয়নি
বিচারব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে অতীতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে জুডিশিয়াল স্ট্রেংথেনিং বা ‘জাস্ট’ প্রকল্প নেওয়া হয়।
এরপর ২০১৭-২০২২ মেয়াদে সুপ্রিম কোর্টের কৌশলগত পরিকল্পনায় ই-জুডিশিয়ারির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এরই ধারাবাহিকতায় নিম্ন আদালতের মামলার তারিখ ও কার্যক্রম অনলাইনে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ই-কজলিস্ট, ‘আমার আদালত’ এবং জুডিশিয়াল মনিটরিং ড্যাশবোর্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিছু সময় এসব প্ল্যাটফর্মে মামলার কার্যতালিকা ও শুনানির তথ্যও পাওয়া গেছে। কিন্তু নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে তথ্য হালনাগাদ না হওয়ায় অনেক সেবাই কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
আইন হয়েছে, বাস্তবায়নে ঘাটতি
বিচারব্যবস্থায় প্রযুক্তি ব্যবহারের আইনি ভিত্তিও তৈরি হয়েছে। করোনাকালে প্রণীত ‘আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০’ অনুযায়ী ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়।
এই আইনের আওতায় বিচার, বিচারিক অনুসন্ধান, আবেদন ও আপিলের শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক এবং আদেশ বা রায় দেওয়ার মতো কার্যক্রম প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া দেওয়ানি কার্যবিধিতে সংশোধনের মাধ্যমে মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ, ই-মেইলসহ ডিজিটাল মাধ্যমে সমন জারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
২০২২ সালে সাক্ষ্য আইন সংশোধনের মাধ্যমে অডিও, ভিডিও, ডিজিটাল স্বাক্ষর, ফরেনসিক ও ডিএনএসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক রেকর্ডকে নির্দিষ্ট শর্তে আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে।
অর্থাৎ আইন ও নীতিগত কাঠামোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও বাস্তব প্রয়োগের জায়গায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
আদালত বদলালেই বাড়ে ভোগান্তি
মামলা একটি আদালত থেকে অন্য আদালতে স্থানান্তর হলে তথ্য পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। আমলি আদালত থেকে বিচারিক আদালতে মামলা স্থানান্তর, বিচারকের এখতিয়ার পরিবর্তন কিংবা প্রশাসনিক কারণে মামলা অন্য আদালতে গেলে সংশ্লিষ্ট তথ্য দ্রুত অনলাইনে না থাকায় আইনজীবীদের রেজিস্টার খাতা ঘেঁটে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়।
এর ফলে অনেক সময় মামলার পরবর্তী তারিখ সম্পর্কে পক্ষগুলো সময়মতো জানতে পারে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ করতে একাধিকবার আদালতে যেতে হয়।
বিচারসংশ্লিষ্টদের মতে, এতে শুধু বিচারপ্রার্থীর সময় ও অর্থের অপচয় হয় না, আদালতের কর্মীদের ওপরও অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ তৈরি হয়।
দুর্নীতির সুযোগও তৈরি হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলার তথ্য যত বেশি অস্বচ্ছ ও ব্যক্তিনির্ভর থাকবে, তত বেশি মধ্যস্বত্বভোগী বা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মামলার নম্বর, পক্ষগুলোর নাম, আইনজীবীর তথ্য, মামলার ধরন, বর্তমান অবস্থান, পরবর্তী শুনানির তারিখ এবং আদেশের সংক্ষিপ্ত তথ্য পাওয়া গেলে বিচারপ্রার্থীদের আদালতকেন্দ্রিক নির্ভরতা অনেকটাই কমবে।
একই সঙ্গে আদালতের প্রশাসনিক কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও বাড়বে।
কীভাবে হতে পারে পূর্ণাঙ্গ ই-কোর্ট ব্যবস্থা
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি কেন্দ্রীয় ও নিরাপদ ই-জুডিশিয়ারি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক জায়গায় আনা সম্ভব।
মামলা দায়েরের সময়ই অনলাইনে মামলার ধরন, বাদী-বিবাদীর নাম, আইনজীবীর তথ্য, মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং প্রয়োজনীয় নথির ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
এরপর মামলার প্রতিটি ধাপ—শুনানির তারিখ, আদালত পরিবর্তন, আদেশ, পরবর্তী তারিখ এবং মামলার বর্তমান অবস্থান—স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালনাগাদ করা যেতে পারে।
মামলা নম্বর জানা না থাকলেও পক্ষের নাম, আইনজীবীর নাম বা অন্যান্য নির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে মামলার প্রাথমিক অবস্থা খুঁজে পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
এ ছাড়া বিচারপ্রার্থীর মোবাইলে এসএমএস বা অ্যাপ নোটিফিকেশনের মাধ্যমে শুনানির তারিখ ও গুরুত্বপূর্ণ আদেশের তথ্য পাঠানো হলে আদালতে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াতও কমবে।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইতোমধ্যে উদাহরণ
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আতিকুর রহমান ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের মামলাগুলোর তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন। সেখানে মামলার পরবর্তী তারিখ ও সর্বশেষ অবস্থা যুক্ত করা হচ্ছে। এমনকি এসএমএসের মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীদের শুনানির তারিখ জানানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারি পর্যায়ে ই-কজলিস্ট ও ই-বদলি রেজিস্টার কার্যকরভাবে চালু করা গেলে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা সরাসরি এসব সেবা নিতে পারবেন।
তার মতে, বিচারব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা অত্যন্ত কঠিন কাজ নয়। দক্ষ জনবল নিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে ধাপে ধাপে ই-কজলিস্ট ও ই-রেজিস্টার চালু করা সম্ভব।
সরকারের পরিকল্পনায় ‘ই-জুডিশিয়ারি’
বিচারব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যবস্থায় নেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে সরকার। আইনমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন, বিচারব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্যে ‘ই-জুডিশিয়ারি’ প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রকল্পটির ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজ চলছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মামলা দায়ের, কেস ট্র্যাকিং, কজলিস্ট ব্যবস্থাপনা, নথি সংরক্ষণসহ বিচারসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রযুক্তি এখন আর বিলাসিতা নয়
বাংলাদেশে ব্যাংকিং, ভূমি, কর, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক সেবার বড় অংশ যখন অনলাইনে চলে এসেছে, তখন বিচারব্যবস্থার মৌলিক তথ্য পেতে রেজিস্টার খাতা নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে শুধু নতুন আইন প্রণয়ন নয়—সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং নিয়মিত তথ্য হালনাগাদের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ বিচারপ্রার্থীর কাছে একটি মামলার পরবর্তী তারিখটিও অনেক সময় ন্যায়বিচারের পথে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সেই তথ্য পেতে যদি তাকে দিনের পর দিন আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয়, তাহলে ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিচারব্যবস্থার এই বৈপরীত্য দূর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

