ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

১৩ বছরের মা, ৭ মাসের সন্তান: আইনের কাঠগড়ায় বাল্যবিয়ে, প্রতারণা ও অভিভাবকত্বের লড়াই

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ১, ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম

১৩ বছরের মা, ৭ মাসের সন্তান: আইনের কাঠগড়ায় বাল্যবিয়ে, প্রতারণা ও অভিভাবকত্বের লড়াই

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীর হাজারীবাগের মাত্র ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী এবং তার সাত মাস বয়সী শিশুকে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। টিকটকে পরিচয় থেকে শুরু করে ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া, নোটারির মাধ্যমে কথিত বিয়ে, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, সন্তান জন্মের পর মা ও সন্তানকে আলাদা করে দেওয়া এবং পরে আইনি সহায়তায় শিশুকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাপ্রবাহ এখন সামাজিক ও আইনি দুই ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের নির্দেশে বর্তমানে শিশুটি তার কিশোরী মায়ের জিম্মায় রয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। আগামী মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে অনুষ্ঠিতব্য শুনানিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের পর শিশুর স্থায়ী অভিভাবকত্ব এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর আলোচনায়

গত ২৮ জুলাই ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে শুনানির সময় সাত মাস বয়সী শিশুকে কোলে নিয়ে বসে থাকা ১৩ বছর বয়সী ওই কিশোরীর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। শিশুকে ফিরে পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি একটি নাবালিকা কীভাবে এমন পরিস্থিতির শিকার হলো—তা নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা।

লিগ্যাল এইড অফিসার মো. সায়েম খান মানবিক দিক বিবেচনায় আপাতত শিশুটিকে মায়ের জিম্মায় রাখার নির্দেশ দেন এবং পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেন।

টিকটকের পরিচয় থেকে কথিত সংসার

কিশোরীর পরিবারের দাবি, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় টিকটকের মাধ্যমে শাকিল মিয়া (২২) নামে এক যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মাত্র কয়েক মাসের পরিচয়ের পর নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরিবারের অভিযোগ, কোনো বৈধ কাবিন ছাড়াই নোটারির মাধ্যমে ভুয়া বিয়ের কাগজ তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে সন্তান জন্মের কয়েক মাস পর শিশুটিকে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে দেওয়া হয় এবং কিশোরীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

নিজের সন্তানকে ফিরে পেতে চলতি বছরের ২০ মে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে আবেদন করেন ওই কিশোরী। আদালতের নির্দেশে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে এবং পরবর্তীতে মায়ের জিম্মায় দেয়।

‍‍`আমাকে প্রতারণা করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল‍‍`

ভুক্তভোগী কিশোরীর ভাষ্য, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। দুই মাসের পরিচয়ের পর শাকিল তাকে বোঝান যে দুই পরিবার কখনো তাদের সম্পর্ক মেনে নেবে না। পরে তাকে কেরানীগঞ্জে নিয়ে গিয়ে কথিত বিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, পরে আদালতে গিয়ে জানতে পারেন নোটারির মাধ্যমে করা কাগজের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তখনই বুঝতে পারেন, তার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।

কিশোরীর অভিযোগ, শাকিল ও তার পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। এমনকি কয়েকবার হত্যাচেষ্টাও করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, "আমার সন্তান জন্মের পর কয়েক মাস যেতে না যেতেই আমাকে সন্তান থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়। এখন আমি শুধু চাই আমার সন্তান আমার কাছেই থাকুক এবং যারা আমার জীবন নষ্ট করেছে তাদের বিচার হোক।"

বাবার অভিযোগ: ‍‍`নাবালিকা জেনেও মেয়েকে নিয়ে গেছে‍‍`

কিশোরীর বাবা জুয়েল খান বলেন, মেয়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের বিষয়টি জানতে পেরে তিনি ছেলের পরিবারকে জানিয়েছিলেন যে তার মেয়ে নাবালিকা এবং এখন বিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

তার অভিযোগ, প্রথমে আশ্বাস দিলেও পরে ফুসলিয়ে মেয়েকে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন। পরে আবারও বিভিন্ন কৌশলে মেয়েকে নিয়ে গিয়ে কথিত বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, মেয়ের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং সন্তান জন্মের পর তাকে সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং নাতির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

অভিযুক্ত শাকিলের বক্তব্য

অন্যদিকে অভিযুক্ত শাকিল মিয়া সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তার দাবি, বিয়ের সময় তাকে যে জন্মসনদ দেখানো হয়েছিল সেখানে মেয়েটির বয়স ২০ বছর উল্লেখ ছিল। পরে আদালতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন অন্য নথিতে বয়স ১৩ বছর।

তিনি আরও দাবি করেন, মেয়েটি স্বেচ্ছায় তার সঙ্গে গিয়েছিল এবং তিন মাস আগে বাবার অসুস্থতার কথা বলে সন্তান রেখে বাড়ি চলে যায়।

অভিভাবকত্ব নিয়ে আদালতে লড়াই

শিশুর স্থায়ী অভিভাবকত্ব চেয়ে পারিবারিক আদালতে মামলা করেছেন শাকিল মিয়া।

অন্যদিকে কিশোরীর পরিবার বলছে, শিশুটিকে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করতেই এই মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে শিশুটি মায়ের জিম্মায় থাকলেও স্থায়ী হেফাজতের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।

ধর্ষণের অভিযোগে নতুন মামলা প্রস্তুত

কিশোরীর পরিবার পুরো ঘটনাকে ধর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

পরিবারের আইনজীবী জানিয়েছেন, নাবালিকাকে অপহরণ, প্রতারণা ও ধর্ষণের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

বিয়ের বয়স ও আইনের অবস্থান

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নারীর বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং পুরুষের ২১ বছর।

আইনজীবীরা বলছেন, বয়সের শর্ত পূরণ না হলে সেই বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া ভয়ভীতি, প্রতারণা বা জোরপূর্বক আদায় করা সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন কোনো বিয়েও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

নোটারির মাধ্যমে বিয়ে কি বৈধ?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা অ্যাফিডেভিট মুসলিম বিয়ের বৈধ বিকল্প নয়।

মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে কাবিন নিবন্ধন সম্পন্ন হলেই কেবল সেই বিয়ে আইনগত স্বীকৃতি পায়।

নোটারির কাগজের ভিত্তিতে দেনমোহর, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার কিংবা বৈবাহিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

১৬ বছরের কম বয়সে যৌন সম্পর্ক: আইনের দৃষ্টিতে ধর্ষণ

২০২৬ সালে সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে তার সম্মতি থাকুক বা না থাকুক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।

আইনজীবীদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর সম্মতির প্রশ্ন নয়, বরং বয়সই আইনি বিচারের মূল বিষয়।

পরবর্তী শুনানির দিকে তাকিয়ে দুই পক্ষ

ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের বেঞ্চ সহকারী জানিয়েছেন, আগামী মঙ্গলবার নির্ধারিত শুনানিতে শিশুর অভিভাবকত্ব, কথিত বিয়ের বৈধতা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলায় শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ, অপহরণ, ধর্ষণ ও প্রতারণাসংক্রান্ত অভিযোগ পৃথক আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে।

এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, বাল্যবিবাহ, বয়স গোপন করে বিয়ের চেষ্টা এবং নাবালিকাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের দ্রুত আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!