যুদ্ধবিরতির আট মাস পেরিয়ে গেলেও গাজা উপত্যকায় স্বাভাবিক জীবন এখনো ফিরেনি। বোমাবর্ষণ কমলেও ধ্বংসস্তূপ, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি এবার নতুন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে ইঁদুরের উপদ্রব। আশ্রয়শিবিরে ঘুমন্ত শিশুদের ইঁদুরে কামড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ শহরের ১৪ বছর বয়সী কারাম এখনো একটি পুরোনো ফুটবল বুকে আঁকড়ে ধরে হাঁটে। একসময় বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই কিশোরের জীবনে এখন নেই খেলার মাঠ, নেই বন্ধুদের কোলাহল। চারপাশে শুধু ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর, পুড়ে যাওয়া ভূমি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
যুদ্ধবিরতির পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার নানা উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতির কথা শোনা গেলেও গাজার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। চুক্তি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহার, নতুন প্রশাসন গঠন এবং আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনার বড় অংশই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে ইসরায়েল বিভিন্ন এলাকায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে, অন্যদিকে হামাসও অস্ত্র সমর্পণ না করায় সাধারণ মানুষ দুই পক্ষের সংঘাতের মাঝেই আটকে রয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ১৯ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছে। এসব শিবিরে বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন ব্যবস্থার তীব্র সংকট রয়েছে। গরম, ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধের কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বাস্তুচ্যুতরা।
এরই মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে ইঁদুর ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীর উপদ্রব। মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে ইঁদুর তাঁবুর কাপড় কেটে ভেতরে ঢুকে ঘুমন্ত শিশুদের কামড়ে দিচ্ছে। সন্তানদের নিরাপদ রাখতে অনেক পরিবার রাতভর জেগে থাকছে। খাবারও ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা করতে তাঁবুর ছাদে ঝুলিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
এদিকে বহু এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো মরদেহ পড়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনেক পরিবারই এখনো জানে না তাদের স্বজন জীবিত নাকি নিহত হয়েছেন। সময়ের সঙ্গে দুর্গন্ধ ও সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, ত্রাণ সরবরাহে বিভিন্ন বাধা থাকায় বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও জরুরি সামগ্রীর সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির দীর্ঘ সময় পরও গাজার মানুষের কাছে শান্তি এখনো অধরা। প্রতিটি দিন তাদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা, নতুন ভয় এবং টিকে থাকার কঠিন সংগ্রামের নাম।

