ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

রাতভর উত্তাল দিল্লি: পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে রাজপথে হাজারো বিক্ষোভকারী, থামছে না আন্দোলন

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ১১:০৮ এএম

রাতভর উত্তাল দিল্লি: পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে রাজপথে হাজারো বিক্ষোভকারী, থামছে না আন্দোলন

ছবিঃ সংগৃহীত

সূর্যাস্তের পরও থামেনি ভারতের রাজধানী দিল্লির আন্দোলনের উত্তাপ। দিনের বিক্ষোভ শেষে রাতভর রাজপথে অবস্থান নেন হাজারো আন্দোলনকারী। বিভিন্ন স্লোগান, জাতীয় পতাকা, প্ল্যাকার্ড এবং মোবাইল ফোনের আলোয় মুখর হয়ে ওঠে মধ্য দিল্লির জন্তর মন্তর এলাকা। পুলিশের কড়া নিরাপত্তা, ব্যারিকেড এবং সংঘর্ষের পরও আন্দোলনকারীরা পিছু হটেননি; বরং আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (২০ জুলাই) আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা শুরু করলে দিল্লি পুলিশ তাদের বাধা দেয়। একপর্যায়ে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ হলেও কয়েক ঘণ্টা পর আবারও হাজারো মানুষ জন্তর মন্তরে জড়ো হয়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভে নারী, পুরুষ, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ এবং শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে জনপথ রোডে পুলিশের ফেলে রাখা ব্যারিকেডের ওপর উঠে কয়েকজন তরুণ "ইনকিলাব জিন্দাবাদ" স্লোগান দেন। নিচে অবস্থান নেওয়া হাজারো মানুষ করতালি, বাঁশি ও স্লোগানের মাধ্যমে তাদের প্রতি সংহতি জানান। একই সঙ্গে "লড়েঙ্গে, জিতেঙ্গে" এবং "নেহি চলেগি, নেহি চলেগি" স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

এদিকে আন্দোলনস্থল জন্তর মন্তর ঘিরে ব্যারিকেড বসিয়েছে দিল্লি পুলিশ। কেবল নির্ধারিত কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যদের নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে।

আন্দোলনকারীদের অনেকের হাতে ছিল ভারতের জাতীয় পতাকা এবং সংবিধানের প্রধান স্থপতি ড. বি. আর. আম্বেদকরের প্রতিকৃতি। অনেকেই জানান, এই আন্দোলন শুধু একটি দাবির জন্য নয়, বরং গণতান্ত্রিক অধিকার ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লড়াই।

বিক্ষোভে আহতদের মধ্যে ছিলেন ২০ বছর বয়সী ভিডিও এডিটর মোহাম্মদ আয়ান। ইন্ডিয়া গেটের কাছে মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের শেলের আঘাতে তার মাথায় গুরুতর জখম হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পরও তিনি আবার জন্তর মন্তরে ফিরে আসেন।

আয়ান বলেন, "অল্প কিছুদূর এগোনোর পরই পুলিশ আমাদের ওপর চড়াও হয়। দৌড়ানোর চেষ্টা করেও বাঁচতে পারিনি। কাঁদানে গ্যাসের শেল মাথায় লাগে। আমি শ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমার বাবার বয়সী মানুষদেরও মার খেতে দেখেছি। তারপরও আমরা ফিরব না।"

তিনি আরও বলেন, "আজ যদি আমরা পাশে না দাঁড়াই, তাহলে আগামীকাল আর কেউ দাঁড়াবে না। সরকারকে বুঝতে হবে, আমরা ঘরে ফিরছি না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকব।"

উত্তর প্রদেশের মউ জেলার বাসিন্দা এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শ্রেয়াংশ চন্দ্র ভাস্কর জানান, এটি তার সপ্তমবারের মতো এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ। তার ভাষায়, পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস আন্দোলনকারীদের ভয় দেখানোর বদলে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে।

তিনি বলেন, "আপনি কি জানেন কেন এত মানুষ আবার ফিরে এসেছে? কারণ আমরা আর ভয় পাই না। জবাবদিহিতা চাইতে গিয়ে যারা আমাদের শাস্তি দেয়, তাদের আমরা ভয় করি না। পুলিশ যখন লাঠিচার্জ করল, তখনই আমাদের ভয় শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা আরও শক্তিশালী।"

একই ধরনের বক্তব্য দেন ২৪ বছর বয়সী কবি ও লেখক দিবাকর লিহাজ। তিনি বলেন, পুলিশের কঠোর অবস্থান আন্দোলনের গতি থামাতে পারেনি; বরং তা আরও বিস্তৃত করেছে।

তার ভাষায়, "আজ যা ঘটেছে, তার পরও মানুষ রাজপথে ফিরেছে। কারণ তরুণ প্রজন্ম জবাবদিহিতা চায়। সরকার যতদিন এই ঘটনার ব্যাখ্যা না দেবে, ততদিন আন্দোলন চলবে।"

তিনি আরও বলেন, "সরকার জনগণের জন্য। কিন্তু আজ সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারের এমন দূরত্ব তৈরি হয়েছে যে কথা বলার জন্যও আন্দোলন করতে হচ্ছে। এটি গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।"

দিল্লি পুলিশ আন্দোলনস্থলের চারপাশে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রেখেছে। তবে ব্যারিকেড, টহল ও নজরদারির মধ্যেও আন্দোলনকারীরা লাইভ সম্প্রচার, মোবাইল ফোনের আলো এবং স্লোগানের মাধ্যমে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন।

পরিস্থিতি নিয়ে এখনও কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লির এই আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!