নেপালের মধ্যাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানির পর এবার নতুন করে মানবিক ও জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখে পড়েছে দেশটি। ত্রিশূলী, মারস্যাংদী ও নারায়ণী নদীর অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা ও ধসের পর উদ্ধার হওয়া শত শত মরদেহ সংরক্ষণ, শনাক্তকরণ ও স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
মরদেহের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোর মর্গের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে কমিউনিটি সেন্টার, পুলিশ কম্পাউন্ডসহ বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে মরদেহ রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত হিমায়িতকরণ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক মরদেহ দ্রুত পচন ধরছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ত্রাণকর্মীরা।
শুধু দুই জেলাতেই প্রায় ৪০০ মরদেহ উদ্ধার
জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত শুধু চিতওয়ান জেলাতেই ২৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী পূর্ব নওয়ালপরাসী জেলা থেকে উদ্ধার হয়েছে আরও ১৫৪টি মরদেহ।
এর বাইরে গোর্খা, ধাদিং, নুওয়াকোট, তানাহুন, পশ্চিম নওয়ালপরাসী ও রাসুয়াসহ একাধিক জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আরও বহু মরদেহ। দুর্গম এলাকা, নদীর তীব্র স্রোত এবং ভূমিধসের কারণে সব মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্বজনদের অপেক্ষা, অস্থায়ী লাশকেন্দ্রে ভিড়
চিতওয়ানের ভরতপুরে বিদ্যুৎ অফিস রোডের একটি অস্থায়ী লাশকেন্দ্রের বাইরে নিখোঁজ স্বজনদের ছবি ও মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছেন শতাধিক মানুষ। কারও হাতে নিখোঁজ স্বজনের ছবি, কেউ আবার মরদেহের তালিকায় নিজের পরিবারের সদস্যের নাম খুঁজছেন।
বন্যার পানির প্রবল স্রোতে অনেক মরদেহ কয়েক কিলোমিটার দূরে ভেসে গেছে। কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপের আঘাতে বহু মরদেহের চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় চোখে দেখে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফলে মরদেহ শনাক্তে ট্যাটু, গয়না, পোশাক, আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ পরীক্ষার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
বুকের ট্যাটু দেখে শনাক্ত স্বজনকে
পূর্ব নওয়ালপরাসীর মধ্যবিন্দু পৌর হাসপাতালে এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। এক স্বজন সুমন গোলার মরদেহ কেবল বুকের ট্যাটু দেখে শনাক্ত করেন।
তার মামা উমেশ স্যাংবো বলেন, বন্যার পানি ও পাথরের আঘাতে মরদেহটির চেহারা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে সুমনকে চেনার কোনো উপায় ছিল না। বুকের ওপর স্ত্রীর নাম লেখা ট্যাটু দেখেই তারা মরদেহটি শনাক্ত করেন।
এ ধরনের ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে শুধু প্রাণহানিই ঘটেনি; মরদেহ শনাক্তকরণও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মরদেহ সংরক্ষণে তীব্র সংকট
চিতওয়ানের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল জানিয়েছেন, মরদেহ সংরক্ষণের জন্য শুষ্ক বরফ (ড্রাই আইস) এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল হওয়ায় পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
ভরতপুরের অস্থায়ী মরদেহকেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবী সুবাস সুনার বলেন, লাশকেন্দ্রের বাইরে দুর্গন্ধ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য সেখানে অবস্থান করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা গেলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে।
পোখরার মর্গেও ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মরদেহ
নেপালের কাস্কি জেলাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। পোখরা একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সেসের মর্গে মাত্র ৭২টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা থাকলেও সেখানে ইতোমধ্যে ১০২টি মরদেহ রাখা হয়েছে।
পোখরা শহরের সব হাসপাতাল মিলিয়ে হিমায়িত সংরক্ষণ ব্যবস্থার মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৮৮টি। ফলে নতুন করে মরদেহ আসতে থাকলে সেগুলো কোথায় রাখা হবে, তা নিয়ে প্রশাসনকে বড় সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
কাস্কি জেলার প্রধান জেলা কর্মকর্তা কুমান সিং গুরুং বলেন, পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে আরও মরদেহ পোখরায় পাঠানোর অনুরোধ করা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে থাকা মরদেহগুলো হস্তান্তর বা দাফন না হওয়া পর্যন্ত নতুন মরদেহ গ্রহণ করার সক্ষমতা তাদের নেই।
এক ফ্রিজারে দুটি করে শিশুর মরদেহ
স্থান সংকট কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, তার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে কাস্কি জেলা পুলিশের বক্তব্যে। জেলা পুলিশ প্রধান সুপারিনটেনডেন্ট নবীন কার্কি জানান, জায়গার অভাবে কোনো কোনো ফ্রিজার চেম্বারে দুটি করে শিশুর মরদেহ রাখা হচ্ছে। এমনকি খণ্ডবিখণ্ড দেহাংশও একই জায়গায় রাখতে হচ্ছে।
এতে মরদেহ সংরক্ষণ, শনাক্তকরণ ও ফরেনসিক পরীক্ষা—তিনটি প্রক্রিয়াই জটিল হয়ে উঠছে।
১০ থেকে ১৪ দিনের বেশি মরদেহ রাখা কঠিন
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পোখরার বিদ্যমান হিমাগারগুলোতে সাধারণত ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রাখা যায়। এই তাপমাত্রায় মরদেহ সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব।
এর বেশি সময় মরদেহ সংরক্ষণ করতে হলে সাব-জিরো ফ্রিজিং ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু গণ্ডকী প্রদেশে এ ধরনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
ফলে দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ এবং আইনগত প্রক্রিয়া শেষ করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর অথবা যথাযথভাবে দাফনের ওপর জোর দিচ্ছে প্রশাসন।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের ঘাটতিও বড় সমস্যা
পূর্ব নওয়ালপরাসীতে নির্দিষ্ট ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের ঘাটতি থাকায় সাধারণ চিকিৎসকদের দিয়েই প্রাথমিক ময়নাতদন্ত করানো হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঠমান্ডু থেকে জরুরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
এদিকে আদালত ও পুলিশি কাগজপত্রের বিভিন্ন জটিলতার কারণে ময়নাতদন্ত ও মরদেহ হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে। তবে বিপুলসংখ্যক মরদেহের কারণে প্রশাসন এখন এসব প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা করছে।
শনাক্ত না হলে দাফন, তবে রাখা হচ্ছে ডিএনএ নমুনা
মর্গের ধারণক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেলে নেপালের ২০২১ সালের ‘অশনাক্ত ও বেওয়ারিশ মরদেহ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা’ অনুযায়ী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মরদেহ দাফন করা হতে পারে।
তবে গণদাফনের আগে প্রতিটি মরদেহের ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ সংগ্রহ এবং ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রতিটি মরদেহকে দেওয়া হচ্ছে একটি স্থায়ী শনাক্তকরণ নম্বর। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো পরিবার মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারলে সেই নম্বরের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সমাধিস্থল শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
ডিএনএ পরীক্ষায় লাগতে পারে ৫–৬ মাস
সংগৃহীত ডিএনএ নমুনা কাঠমান্ডুর গবেষণাগারে পাঠানো হচ্ছে। তবে শত শত মরদেহের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি এবং পরিবারের সদস্যদের নমুনার সঙ্গে চূড়ান্ত মিল করতে পাঁচ থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ কারণে নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের জন্য অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার এখনো জানে না তাদের প্রিয়জন জীবিত নাকি বন্যার স্রোতে হারিয়ে গেছেন।
উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি বাড়ছে মানবিক সংকট
নেপালের মধ্যাঞ্চলের এই দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান যেমন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনি উদ্ধার হওয়া মরদেহের ব্যবস্থাপনাও এখন জরুরি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। একদিকে দুর্গম এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার, অন্যদিকে সংরক্ষণ, শনাক্তকরণ, ময়নাতদন্ত এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তর—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে প্রশাসনকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত অতিরিক্ত ফ্রিজিং ব্যবস্থা, ড্রাই আইস, ফরেনসিক দল ও ডিএনএ পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে মরদেহ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা এবং নিখোঁজদের পরিবারের জন্য সমন্বিত তথ্যকেন্দ্র চালু করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, বন্যা ও ভূমিধসের তাৎক্ষণিক ধাক্কার পর নেপাল এখন যে দ্বিতীয় দফার সংকট মোকাবিলা করছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মরদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্তকরণ। আর এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে তা মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

