ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

ভারতগামী স্থলপথ বন্ধে ধুঁকছে পাবনার ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারি শিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১২:০০ পিএম

ভারতগামী স্থলপথ বন্ধে ধুঁকছে পাবনার ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারি শিল্প

ছবিঃ সংগৃহীত

প্রায় দুই শতকের ঐতিহ্যবাহী পাবনার হোসিয়ারি শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে। ভারতের সঙ্গে স্থলপথে পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে, উৎপাদন কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে এবং কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক। ব্যাংকঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শিল্পখাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

পাবনা শহরের সাধুপাড়া মহল্লার হোসিয়ারি উদ্যোক্তা আরিফ হোসেন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি বড় হোসিয়ারি কারখানা। সেখানে প্রায় ৪০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছিল। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে গেঞ্জি ও অন্যান্য পোশাক রপ্তানি করে লাভজনক ব্যবসাও চলছিল। কিন্তু স্থলপথে ভারত রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উৎপাদিত পণ্য গুদামেই আটকে পড়ে। বিক্রি না হওয়ায় লোকসান বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি। এর ফলে ৪০০ শ্রমিক চাকরি হারান এবং ঋণের চাপে কার্যত দেউলিয়া হয়ে পড়েন এই উদ্যোক্তা।

শুধু আরিফ হোসেন নন, একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন পাবনার শত শত উদ্যোক্তা। জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, পাবনায় প্রায় তিন হাজার হোসিয়ারি কারখানায় একসময় লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে রপ্তানি সংকটের কারণে প্রায় ৬৫ শতাংশ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কারখানা বন্ধ হচ্ছে।

জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের সভাপতি সেলিম সরদার বলেন, দেশের মোট হোসিয়ারি পণ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশই পাবনা থেকে রপ্তানি হতো। কিন্তু স্থলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা প্রতিদিন লোকসান গুনছেন। অনেকেই পাওনাদারের চাপ সামলাতে পারছেন না। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিল্পটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

দুই শতকের ঐতিহ্যের শিল্প

পাবনার হোসিয়ারি শিল্পের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের। একসময় ইছামতী নদীপথ ব্যবহার করে বিদেশ থেকে উন্নতমানের সুতা আমদানি করে গেঞ্জি উৎপাদন করা হতো। দেশভাগের পর শিল্পে ধস নামলেও পরবর্তীতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের হাত ধরে এটি আবার ঘুরে দাঁড়ায়। নব্বইয়ের দশক থেকে তৈরি পোশাক কারখানার ঝুট কাপড় ব্যবহার করে গেঞ্জি, শার্ট, সোয়েটার, মোজা ও অন্যান্য পোশাক উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পটির ব্যাপক প্রসার ঘটে। ভারত, মালয়েশিয়া, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এসব পণ্যের বড় বাজার গড়ে ওঠে।

স্থলপথ বন্ধ, বেড়েছে খরচ ও সময়

কারখানামালিকরা জানান, আগে ট্রাকযোগে স্থলপথে প্রতি সপ্তাহে শতাধিক ট্রাক হোসিয়ারি পণ্য ভারতে রপ্তানি হতো। এতে নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো এবং মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই রপ্তানির অর্থ পাওয়া যেত।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে নৌপথে সীমিত আকারে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। পাশাপাশি ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগছে পণ্য পৌঁছাতে এবং অর্থ হাতে আসতে লেগে যাচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ দিন। ফলে ব্যবসার মূলধন আটকে যাচ্ছে এবং নতুন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

গুদামভর্তি পণ্য, কমেছে উৎপাদন

সম্প্রতি পাবনা শহরের সাধুপাড়া, বাংলাবাজার, দিলালপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ কারখানার গুদাম উৎপাদিত গেঞ্জি ও পোশাকে ভর্তি। বস্তাবন্দি ঝুট কাপড়ও পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। অনেক কারখানায় অর্ধেকেরও বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। যেসব শ্রমিক এখনও কাজ করছেন, তাদেরও আগের মতো ব্যস্ততা নেই।

সাধুপাড়া ঝুটপল্লির ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, আগে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানা থেকে আনা ঝুট কাপড়ের চাহিদা এত বেশি ছিল যে সরবরাহ করেও শেষ করা যেত না। এখন গুদামভর্তি কাপড় পড়ে আছে। কাজ না থাকায় ১৫ জনের মধ্যে ১০ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করতে হয়েছে।

কর্মহীন শ্রমিকদের মানবিক সংকট

কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন শ্রমিকরা। আফজাল হোসেন নামে এক শ্রমিক জানান, দীর্ঘদিন একটি হোসিয়ারি কারখানায় কাজ করার পর এখন তিনি বেকার। নতুন কাজের সন্ধানে ঘুরছেন, কিন্তু কোথাও কাজ মিলছে না।

এ আর কর্নারের কর্মী তরুণ দাস বলেন, রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ প্রায় নেই। সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্যও নেই।

ঋণের বোঝায় জর্জরিত উদ্যোক্তারা

হোসিয়ারি ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন বলেন, অধিকাংশ উদ্যোক্তা ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। রপ্তানি বন্ধ থাকায় আয় না থাকলেও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে অনেকেই আর্থিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

জনি গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক কামরুল হাসান জানান, আগে কয়েক দিনের মধ্যেই রপ্তানির অর্থ পাওয়া যেত। এখন এক মাসের বেশি সময় লাগছে। ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে। আগে যেখানে ৫০০ শ্রমিক কাজ করতেন, এখন রয়েছেন মাত্র ২০০ জন।

দ্রুত সরকারি উদ্যোগের দাবি

পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক এ বি এম ফজলুর রহমান বলেন, পাবনার পরিচিতি ও অর্থনীতির সঙ্গে হোসিয়ারি শিল্প ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই শিল্পকে বাঁচাতে ভারতগামী স্থলপথে রপ্তানি দ্রুত চালু করা জরুরি। সরকারের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি পুনরায় চালু, সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ পুনঃতফসিল, স্বল্পসুদে পুনঃঅর্থায়ন এবং রপ্তানি প্রণোদনা বাড়ানো হলে শিল্পটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় কয়েক দশকের গড়ে ওঠা পাবনার ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারি শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!